এক দিন বন্ধ থাকার পর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে ফের প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। ওপারে গোলাগুলির বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে এপারের সীমান্তের জনপদ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েকশ রাউন্ড গুলি এবং শতাধিক মর্টার শেল বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা। এছাড়া গতকাল ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত কক্সবাজারের উখিয়ার একাধিক সীমান্ত পয়েন্টের ওপারে মিয়ানমারে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) টহল বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে শতাধিক মর্টার শেল বিস্ফোরণ ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা জানান তমব্রু বাজারের ব্যবসায়ী সৈয়দ হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোলার শব্দে সীমান্তের কাছাকাছি মাটির ঘরগুলো কেঁপে উঠছে। একদিন শান্তিতে ছিলাম। আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মুহুর্মুহু বিকট শব্দ শুনেছি। ভয়ে ছেলেমেয়েরা বাড়ি থেকে বের হয় না।’
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের তিন নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ (বৃহস্পতিবার) গোলাগুলি বেশি। এ কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। তবে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি থাকা লোকজনকে এখনো সরিয়ে নেওয়া হয়নি।’
অগের কয়েক দিনের চেয়ে মিয়ানমারে গতকাল গোলাগুলি বেশি হয়েছে বলে জানান তমব্রুর বাসিন্দা মাহামুদুল হাসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্যদিনের তুলনায় আজ বেশি গোলাগুলির শব্দ শুনেছি। বাড়িঘর থেকে কেউ বের হচ্ছে না। বিশেষ করে সকালে বেশি বিকট শব্দ শুনেছি। ওপারে কী অবস্থা বুঝা যাচ্ছে না, ভয় হচ্ছে কখন কী হয়।’
একই গ্রামের ইমাম হোসেন বলেন, ‘আগে তমব্রু বাজারের দোকানপাট ১১টার দিকে বন্ধ হতো। এখন এশার আজান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ দোকান বন্ধ করে চলে যায়। আজ (বৃহস্পতিবার) স্কুলগুলোও বন্ধ ছিল।’
মিয়ানমারে গোলাগুলি বাড়ায় ভয়ে সীমান্তঘেঁষা নিজের চাষের জমিতে যেতে পারছেন না বলে জানান তমব্রু মধ্যমপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান (৫২)। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভয় লাগলেও কী করব? কিছু করে তো খেতে হবে। ক’দিন ধরে গোলাগুলির কারণে নিজের চাষের জমিতে যেতে পারছি না। আমার মতো সীমান্তের কাছাকাছি ক্ষেতখামারে যেতে পারছে না আরও অনেক কৃষক।’
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘সকাল থেকে আবারও থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।’
মিয়ানমারে গোলাগুলি বাড়ায় ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু, বাইশফাঁড়ি, হেডম্যানপাড়া, কোনারপাড়া, জলপাইতলী রেজু, আমতলী, ফাত্রাঝিরি ও চাকমাপাড়াসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে বিজিবি। পাশাপাশি স্থানীয়দের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বসিয়ে যাত্রীবাহী গাড়ি তল্লাশি করছে বিজিবি সদস্যরা। কাউকে সন্দেহ হলে গাড়ি থেকে নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা গেছে।
ঘুমধুম-তমব্রু ছাড়াও গতকাল ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত উখিয়ার একাধিক সীমান্ত পয়েন্টের ওপারে মিয়ানমারের প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া গ্রামের অটোরিকশা চালক আবুল বাশার সকাল থেকে মর্টার শেল বিস্ফোরণের বেশ কয়েকটি বিকট শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা জানান।
ওপারে মিয়ানমারে গোলাগুলি চলায় চরম আতঙ্কে রয়েছে উখিয়ার আঞ্জুমান, রহমতের বিল, ধামনকালী বালুখালী ও ফারির বিলসহ আরও বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা। সীমান্তের কাছাকাছি তাদের অনেকের চিংড়ি ঘের। আবার কেউ কেউ নাফ নদীতে মাছ শিকার করতে যান।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জাফরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোলাগুলির শব্দ বেড়েছে। মানুষ আতঙ্কিত।’
উল্লেখ্য, গত একমাস ধরে তমব্রু সীমান্তের মিয়ানমার অংশে মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে দেশটির জান্তা সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। দুপক্ষের সংঘাতের মধ্যেই মর্টার শেলের গোলা এবং ভারী অস্ত্রের গুলি এসে পড়েছে বাংলাদেশ ভূখন্ডের তমব্রু সীমান্তেও।
