চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি উদ্বেগজনক

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৫২ পিএম

দেশের স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন খাতের ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত তিন থেকে ছয় মাসে ব্যক্তি খাতে চিকিৎসায় ব্যয় বেড়েছে ৪৭ শতাংশ। এ অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে পাঁচ খাতে। এগুলো হলো বিভাগীয় শহরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনদের থাকা-খাওয়া, গণপরিবহন, অ্যাম্বুলেন্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ। এর সঙ্গে চিকিৎসার আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব ধরা হয়নি। শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘৪৭% বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। চিকিৎসায় ব্যক্তির ব্যয় বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. এনামুল হক। তবে তাদের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো গবেষণা বা জরিপ নেই বলেও জানান এ কর্মকর্তা। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমনিতেই আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় বেশি। সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের হিসাবে, ২০২১ সালে এ ব্যয় ছিল ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সেটাও আন্ডার এস্টিমেটেড ছিল। ওটা সঠিকভাবে করলে ৮০ শতাংশও হয়ে যেতে পারে। স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট অন্যদের বক্তব্য থেকেও মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির নানা দিক উঠে এসেছে। এর মধ্যেই কিছুদিন আগে সরকার ৫৩টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া রোগীকে হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে আনা-নেওয়ার যাতায়াত ব্যয়ও বেড়েছে। এই অবস্থায় আগে যেভাবে সাধারণ মানুষ ডাক্তার দেখাত, এখন ডাক্তার দেখানো কমে গেছে। মানুষ এখন একদম ঠেকায় না পড়লে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে না, হাসপাতালমুখী কম হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

খাত হিসেবে দেখলে রোগীকে চিকিৎসা দিতে আনা-নেওয়ার যাতায়াত খরচ যেমন বেড়েছে। তেমিন গুরুতর রোগীদের অ্যাম্বুলেন্সে ও লাশবাহী গাড়িতে আনা-নেওয়ার খরচও বেড়েছে। দেশ রূপান্তরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে রোগীর ব্যয় বেড়েছে গড়ে ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী আনতে বেড়েছে ৩০ শতাংশ ও লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে ৫০ শতাংশ। একইভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ। এর ওপর গত জুলাইয়ে সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয় এমন ১৯টি জেনেরিকের ৫৩টি ওষুধের দাম বাড়ায়। কিছু ওষুধের দাম বাড়ে ১০০ শতাংশেরও বেশি। কোনোটার দাম দ্বিগুণ বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে গড়ে ওষুধের দাম বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। দেশ রূপান্তরে সম্প্রতি প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, দেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ব্যয়ের তুলনায় তিন গুণ বেশি অর্থ ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হচ্ছে। অন্যদিকে কমছে সরকারি ব্যয়। ২৪ বছর ধরেই দেশে স্বাস্থ্যসেবা পেতে সরকারি সেবার বাইরে মানুষের নিজস্ব ব্যয় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সর্বশেষ ২০২০ সালে সরকার স্বাস্থ্যসেবা দিতে যে টাকা ব্যয় করেছে, স্বাস্থ্যসেবা পেতে তার চেয়ে তিন গুণ বেশি টাকা গেছে ব্যক্তির পকেট থেকে। ২০২০ সালে সরকার ব্যয় করেছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৭৪২ মিলিয়ন বা ১৭ হাজার ৯৭৪ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা মোট স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের মাত্র ২৩ শতাংশ। অথচ সে বছর স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির পকেট থেকে গেছে ৫ লাখ ৩২ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন বা ৫৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা, যা মোট স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করেছে সরকারি ব্যয়ের তিন গুণ বেশি।

কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের যে খরচ, তার যদি ১০ শতাংশ বা তার বেশি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয়, তাহলে সে পরিবার বা ব্যক্তি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এটা বাংলাদেশে অনেক বেশি, ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় এশিয়া তো বটেই বৈশ্বিকভাবেও সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (এসকাপ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপ অনুসারে এশিয়ার ৪৮টি দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ ব্যয় করত। সেটা সর্বশেষ বাজেটে কমে দশমিক ৮৯ শতাংশে এসেছে। অর্থাৎ এ সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির আকার বাড়লেও সে অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ার বদলে উল্টো কমেছে। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে না বাড়ানোর কারণ জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশন বলছে, স্বাস্থ্য বিভাগের চাহিদা অনুসারেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এর বেশি বরাদ্দ দিলেও ব্যয় করা যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকায় তারা খুব একটা বেশি বরাদ্দ চায়নি। পরিকল্পনা কমিশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের এমন ব্যাখ্যা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি তা গ্রহণযোগ্যও নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অবশ্যই এ বিষয়ে জবাবদিহি করা উচিত। একইভাবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত