আর কয়েক দিন পর বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। যে উৎসব উপলক্ষে প্রতিমা তৈরি শেষ করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এখন চলছে রংতুলির আঁচড়ে সাজিয়ে নেওয়ার কাজ। এরপর হবে সাজসজ্জা। গত দুই বছর করোনা পরিস্থিতিতে বিধিনিষেধের মধ্যে সীমিত পরিসরে উৎসবটি পালন করা হয়। তাই দেশজুড়েই এবারের আয়োজন হচ্ছে বেশ ঘটা করে। তবে ব্যতিক্রম শুধু বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের একমাত্র দুর্গা মন্দিরে।
সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক মাস ধরে চলা গোলাগুলির বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে এপারের সীমান্তের জনপদও। এ ছাড়া এরই মধ্যে ওপার থেকে ছোড়া বেশ কিছু গুলি ও মর্টার শেলের গোলা এসে পড়েছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডেও। এমন পরিস্থিতিতে ছেদ পড়েছে ঘুমধুমের সনাতনপাড়ায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে উদযাপিত হয়ে আসা শারদীয় দুর্গোৎসবে। গত দুই মাস ধরে নানা আনুষ্ঠানিকতার কাজ গুছিয়ে এনে এখন পূজা উদযাপন নিয়ে শঙ্কিত সেখানকার পূজা উদযাপন কমিটির নেতা ও স্থানীয় সনাতনীরা। ইতিমধ্যে দেবী দুর্গার প্রতিমা মন্দিরে আনা হলেও শূন্য রেখা থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত মন্দির এলাকায় মুহুর্মুহু মর্টার শেল ও গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত সেখানকার ১৭টি সনাতনী পরিবারের ১৫০ জন্য সদস্য। তাই দেবী দুর্গাকে কালো পলিথিনে মুড়িয়ে মন্দিরের একপাশে সুরক্ষিতভাবে রাখা হয়েছে। পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা জানান, প্রতিমা নিয়ে আসা হলেও সীমান্তে উত্তেজনার কারণে রঙের কাজে হাত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
গত বৃহস্পতিবার সকালে ঘুমধুম ইউনিয়ন লাগোয়া সড়ক ধরে সামান্য এগোতেই দেখা যায়, সনাতনপাড়ার নেতৃস্থানীয় সবাই পূজা উদযাপন নিয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করছেন। কিন্তু দুপুর ১২টার পর থেকে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে পরপর ১০টি মর্টার শেল বিস্ফোরণের শব্দে সবাই আতঙ্কিত হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে যান। কিছুক্ষণ বন্ধ থাকার পর আবার সবাই বৈঠক করতে বসেন। সেখানে অনেকে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে পূজা উদযাপনের কথা জানান। আবার কেউ কেউ কোনো ধরনের গান-বাজনা না করা এবং আতশবাজি না ফুটিয়ে শুধু যতটুকু আনুষ্ঠানিকতা করা যায় সেটা করতে অনুরোধ জানান।
এ প্রসঙ্গে তমব্রু বাজার দুর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি রুপলা ধর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাড়ার ১৭টি পরিবার টাকা তুলে মন্দিরের ডেকোরেশনসহ পূজা উদযাপনের সব ধরনের কাজ শুরু করি। প্রতিমাও নিয়ে আসি। কিন্তু মিয়ানমার বর্ডারে দেশটির আর্মির ছোড়া মর্টার শেল ও গুলির শব্দে আশপাশে থাকা কষ্ট হয়ে পড়েছে। কীভাবে আমরা মন্দিরে দুর্গাপুজার আয়োজন করব তা নিয়ে চিন্তিত, শঙ্কিত।’
বান্দরবান জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের উখিয়া বা অন্য কোনো জায়গায় পূজার আয়োজন করতে বলা হয়েছে জানিয়ে রুপলা ধর বলেন, ‘কিন্তু আমরা প্রায় ৫০ বছর ধরে এই একই জায়গায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে পূজার আয়োজন করে আসছি। তাই আমরা পাড়ার সবাই মিলে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা আমরা জেলা পূজা উদযাপন কমিটিসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে যাব। প্রয়োজনে আমরা সব ধরনের গান, বাজনা, উদযাপন বন্ধ করে ব্রাহ্মণ দ্বারা যতটুকু আনুষ্ঠানিকতা করা যায় সেটাই করব। তাও যদি আমরা অনুমতি না পাই তাহলে সরকার যা সিদ্ধান্ত দেয় তা মেনে নেব।’
মন্দিরের দেয়াল ঘেঁষে বসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব শেফালি দাশ। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৫০ বছর ধরে আমরা এখানে পূজা আয়োজন ও উদযাপন করেছি। কত সুন্দর করে সাজানো হতো আমাদের পাড়া। আশপাশে অন্য কোনো মন্দির না থাকায় প্রায় সবাই আমাদের এ মন্দিরে পূজা দিতে আসত। কিন্তু এ বছর মিয়ানমার সীমান্তে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের কারণে আমাদের আনুষ্ঠানিকতা অন্যত্র করতে বলা হয়েছে। কিন্তু মন তা মানে না। নিজের মন্দিরে নিজের দুর্গাকে সবাই মিলে পূজা দেব, এ আনন্দ অন্য কোথায় কীভাবে পাব।’
মন্দিরের পাশের বাসিন্দা শান্ত কুমার সেন বলেন, ‘আমরা আমাদের জায়গা থেকে আমাদের দুটো অনুরোধ জানিয়েছি মন্দির কমিটিকে। তারা রেজল্যুশন ঠিক করে জেলা প্রশাসন ও জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে আলোচনা করবেন। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে আমরা পাড়ার সবাই সেটা মেনে নেব।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্দিরটা মিয়ানমার বর্ডারের এতটাই কাছে যে, যেকোনো সময় কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতির শিকার হলে তখন আমরা কোথায় যাব? তাই সবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা তাদের পরামর্শ দিয়েছি পূজা অন্যত্র করতে পারলে সবার ভালো হয়। না হয় অন্যবারের তুলনায় এবার এখানে উদযাপন কম হবে, কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফাঁড়ির ইনচার্জ এসে মন্দির পরিদর্শন করে গেছেন এবং মন্দির কমিটির সঙ্গে কথা বলে গেছেন। এর মধ্যে যদি পরিস্থিত স্বাভাবিক হয় তাহলে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আমরা তাদের নিজেদের মন্দিরে পূজার আয়োজন করতে বলব। তা ছাড়া আমাদের এলাকায় একটাই মন্দির, সেখানে দুর্গাপূজা না হলে আমাদেরও খারাপ লাগবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি টানটু সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পূজা উদযাপনের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। জেলা প্রশাসন ও বিজিবি বিষয়গুলো দেখছে। তারাই ভালো বলতে পারবে। আপনি বিজিবি থেকে তথ্য নিন।’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তথ্য অনুযায়ী এবারের দুর্গাপূজা আগামী ১ অক্টোবর শুরু হবে। শেষ হওয়ার কথা ৫ অক্টোবর।
