গ্রামের মানুষ যেদিকে ক্ষমতাও সেদিকে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৫০ পিএম

আমাকে যারা একটু-আধটু চেনেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে সামান্য হলেও আমার লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত, তারা জানেন বাম রাজনীতির প্রতি আমার কিঞ্চিৎ দুর্বলতা আছে। আমি এখনো বিশ্বাস করি, পুঁজির বল্গাহীন অত্যাচারের বিরুদ্ধে একমাত্র বামপন্থাই জনতাকে স্বস্তি দিতে পারে।

তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, আমি যান্ত্রিকভাবে বামেদের যাবতীয় বিষয়কে মেনে নিই। বামেদের বলতে আপাতত আমি পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার বামেদের কথা বলছি। কয়েক বছর আগে দেয়ালে লেখা হতো ‘মার্ক্সবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা বিজ্ঞান।’ এ ধরনের উদ্ভট স্লোগান দেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই ৩৪ বছরের বাম শাসন আক্ষরিক অর্থেই তাসের ঘরের মতো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল।

কিছুমাত্র রাজনৈতিক দিশা ছাড়াই রাজ্যের ক্ষমতা দখল করল কংগ্রেসের ভেতরের চরমপন্থি অংশ। তৃণমূল ক্ষমতায় এলো স্রেফ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তি ক্যারিশমা ও অন্ধ সিপিআই এম বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়ে। এখনো তৃণমূল কংগ্রেসের মূল শক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন মোহিনী ভাবমূর্তি। এবং নিশ্চিতভাবেই কিছু কিছু সামাজিক প্রকল্প গ্রাম স্তরে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু হালে মমতার অতি বড় সমর্থকও স্বীকার করবেন তৃণমূল কিছুটা হলেও আজ ব্যাকফুটে।

তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে, সিবিআই, ইডি, এনআইএ প্রমুখ কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্সি রাজনৈতিক স্বার্থে তৃণমূল দলকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে, যা কিছুটা ঠিক, তাহলেও গ্রামে-গঞ্জে, মফস্বলে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি যে চরমে উঠেছে তা একটু-আধটু খোঁজ করলেই জানা যায়। তার সঙ্গে প্রবল হয়ে উঠেছে ঔদ্ধত্য ও সীমাহীন স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা।

তার ওপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইদানীং অনেক কর্মসূচিতেই যেভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি প্রকট হচ্ছে, তাতে তৃণমূলের বড় শক্তি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এরই মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মুসলমানদের আরও খারাপ লেগেছে ছাত্রনেতা আনিস খানকে যেভাবে রাতের অন্ধকারে বাড়ি ঢুকে খুন করা হলো, হিন্দু বা মুসলমান বলেও নয়, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ভালো নয়, তা চোখ-কান খোলা রাখলে যে কেউই বুঝবেন।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠবেই যে, পরের বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের ক্ষমতায় আসতে পারবেন কি না! বিধানসভা ভোটের অবশ্য অনেক দেরি আছে। ছাব্বিশ সালে। তার আগে সেমিফাইনাল চব্বিশ সালে। লোকসভা ভোট। তারও আগে, সামনের বছর পঞ্চায়েত নির্বাচন। গ্রামের মানুষ যেদিকে, ক্ষমতাও সেদিকে; এ রকম একটা কথা অনেক দিন ধরেই এ রাজ্যে চালু রয়েছে। ফলে পঞ্চায়েত ভোটের ফলাফল আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অল্প হলেও একটা আভাস দেবে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে যদি তৃণমূল হারে তাহলে কি বিজেপি ক্ষমতায় আসবে! দেখুন, বহুদিন ধরে মিডিয়ায় আছি। ঠান্ডা ঘরে না বসে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যেটুকু যা বুঝছি, তাতে বিজেপি এ রাজ্যে আসবে না। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারাও তা বোধহয় চান না। বরং ঔপনিবেশিক কায়দায় জো হুজুর কাউকে রাজ্যে বসিয়ে নিজেদের এজেন্ডা হাসিল করলে লাভ বেশি এটা বিজেপির মূল চালিকাশক্তি সংঘ পরিবারের নেতৃত্ব বোঝেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবির পরেও আরএসএস নেতারা খোলাখুলি বলেছিলেন যে বিজেপি না জিতলেও আমরা চিন্তিত না। দেখতে হবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি জিতেছে কি না!

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এরই মধ্যে বলতে শুরু করেছেন যে আরএসএসএ অনেক ভালো লোক আছেন। এমনকি নরেন্দ্র মোদি ভালো। অমিত শাহ খারাপ এসব ভুলভাল কথাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন। আবেগের তোড়ে অথবা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে তিনি ভুলে গেছেন ব্যক্তি নয়, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির কাছে বিপদ সংঘ পরিবারের মতাদর্শ।

তা ছাড়া বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে এখনো তেমন কোনো শক্তি নয়। তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিজেপি কাগুজে বাঘ। তাকে প্রবল পরাক্রমশালী আসল বাঘ করা দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মিডিয়া। এ নিয়ে কোথাও কোনো সন্দেহ নেই। কোনোদিন কেউ শুনেছেন যে বিজেপির সামান্য আইন অমান্য কর্মসূচি বিভিন্ন চ্যানেলে লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও এমন হয়!

আসলে করপোরেট পুঁজি বিনিয়োগ করে মিডিয়াকে শাসকদের পুতুল করে তুলেছে। শাপে বর হয়েছে তৃণমূলের। বিজেপির জুজু দেখিয়ে মুসলিম ও ধর্মনিরপেক্ষ ভোটের একাংশকে সংহত করা সহজ হয়ে গেছে।

আমি দীর্ঘদিন অনেক বিষয়েই পশ্চিমবঙ্গের বামেদের সমালোচনা করি। তাদের অতিরিক্ত নরম সংসদনির্ভরতা বিরক্ত লাগে। তা ছাড়া তাদের, বিশেষ করে বামফ্রন্টের বড় শরিকের রাজত্বকালের শেষ দিকে অজস্র নেতিবাচক দিক জনমনে তাদের সম্পর্কে খুব খারাপ ইমেজ তৈরি করেছিল। আমার বাম বন্ধুরা ক্ষুব্ধ হবেন। তাও না বললে মিথ্যে বলা হবে যে নিজেদের কবর নিজেরাই না খুঁড়লে, হাজার যুক্তি থাকলেও বামেদের হটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারা সহজ ছিল না। বামেদের পাশ থেকে অনেক দিন ধরেই গরিব মানুষ মুখ ফেরাচ্ছিলেন। মুসলিম, আদিবাসী, দলিত জনগোষ্ঠীর বড় অংশ একদা ছিল সিপিআই এমের জন ভিত্তি। তাদের জায়গায় ক্রমে ক্রমে পার্টির নীতিনির্ধারক হয়ে উঠতে লাগল শহরের বাবু ভদ্দরলোকরা। পঞ্চায়েত, প্রশাসন হয়ে উঠল পার্টির কুক্ষিগত। পাড়ায় পাড়ায় পার্টি অফিস হয়ে উঠতে লাগল বিকল্প প্রশাসনিক দপ্তর।

তার সঙ্গে ছিল ছোট-বড়-মাঝারি নেতাদের অনেকের মধ্যে গগনচুম্বী অহংকার। পাশাপাশি আর এক বিষয় হয়ে উঠেছিল সিপিআই এমের পতনের কারণ। পার্টির মধ্যে রাজনৈতিক পড়াশোনা শিকেয় উঠেছিল। তৈলমর্দন ছিল দলে ওপরে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ পথ। জনবিচ্ছিন্ন এই আমলাতান্ত্রিক দলকে সরাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুব অসুবিধে হয়নি। পালাবদলের পরপরই রাতারাতি পার্টি কর্মী সমর্থক, এমনকি নেতাদের কেউ কেউ ভোল বদলে তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য হয়ে গেলেন।

তাহলে দলে থাকলেন কারা? যারা পার্টি ও বাম মতাদর্শকে ভালোবাসেন তারা। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর যে বেনো জল চলে গেল তা একদিকে সিপিআই এমকে অনেক সংহত করেছে। গত নির্বাচনে বামেদের ভরাডুবি হয়েছে। তারা স্বাধীনতার পরে এই প্রথম একটি আসনেও জিততে পারেনি। তবুও আজ যদি আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেন, বামেদের অবস্থা কেমন! তারা কতটা রাজনৈতিক জমি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে! আগামী নির্বাচনে তারা কতটা সফল হতে পারেন! জ্যোতিষী না। ওই বিদ্যের ওপর আস্থাও নেই, তাই সব প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে পারব না। কিন্তু এটা জোরের সঙ্গে বলতে পারি, এ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিরোধী পরিসরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে সিপিআই এম ও তার জোট সঙ্গীরা।

মহম্মদ সেলিম সিপিআই এমের রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পরপরই দলটির মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেলিমের নেতৃত্বে গোটা দল এখন যথেষ্ট উজ্জীবিত ভূমিকায় প্রায় প্রত্যেক দিন বহুবিধ কর্মসূচি নিয়ে জেলায় জেলায় প্রশাসনকে বেকায়দায় ফেলছে। মিছিল-মিটিংয়ে ভিড় হচ্ছে চোখে পড়ার মতো।

অনেক বামপন্থি বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন, গ্রামের গরিবরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দান-খয়রাতির লোভে এখনো শত অন্যায় দেখেও ভোট দেবে সেই তৃণমূলকেই। ভুল। সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। শহরে বসে রাজনীতি করার ফলে জনচেতনা সম্পর্কে এই অজ্ঞতা। আমি গ্রামে গ্রামে ঘুরি। গরিবের বড় অংশ মমতার দিক থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন। ভয়ে, আতঙ্কে তারা সেভাবে এখনো মুখ খুলতে পারছেন না। এমনকি মুসলিম ভোটারদের অনেকেই আজ বামমুখী হচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ, শিক্ষিত অংশ। মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে বুঝতে পেরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশি বেশি করে চ-ীপাঠ থেকে দুর্গা পুজো, গঙ্গা সাগর মেলা, গণেশ চতুর্থী, রথযাত্রা, জগন্নাথ দেবের মূর্তি নির্মাণে মন দিচ্ছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অর্থনৈতিক নীতি আজ সব মহলেই সমালোচনার মুখে। ধমক-ধামক দিয়ে নিজেকে এখনো প্রাসঙ্গিক করে রাখলেও, ছবিটা বদলাচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া বৈছে, তা স্পষ্ট। এই মৃদু হাওয়াকে ঝড়ে পরিণত করতে সিপিআই এমকে আরও অনেক পথ যেতে হবে। পথ খুবই কঠিন। ভোট করতে তৃণমূল দেবে বলে মনে হয় না। তাদের হাতে আজ প্রচুর টাকা। এ দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় টাকা সময়ে নির্ণায়ক শক্তি হয়ে ওঠে। সিপিআই এমের সামনে নিরন্তর গণ-আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। আর দরকার লড়াকু কর্মীবাহিনী। ভোট লুট আটকাতে না পারলে হাজারো মিছিল-মিটিং কোনো কাজে আসবে না।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত