বড় নৌযান দুর্ঘটনায় পড়লে এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি হয়। ছোট নৌযান দুর্ঘটনায় পড়লে কোনো তদন্ত কমিটি হয় না। আর সেই দুর্ঘটনা যদি ঘটে অবাণিজ্যিক নৌরুটে তাহলে প্রশাসন তার খবরই রাখে না। এখনো দেশের সব নৌযান নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। যতদিন নৌযান নিবন্ধন ও তদারকির আওতায় না আসবে ততদিন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে নিবন্ধিত নৌযানের দুর্ঘটনা হলে তার দায় আমরা দিতে পারি তদারকি সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ)। যখন অনিবন্ধিত নৌযানের দুর্ঘটনা ঘটে তার দায় নেওয়ার কেউ থাকে না। আমাদের কত নৌযান আছে, তার সঠিক তথ্য নেই। স্থানীয় পর্যায়ে যেসব নৌযান নদীতে চলছে সেসবের চালকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। আকার অনুযায়ী কতজন যাত্রী বহন করতে পারবে, অনেক সময় তাও নির্ধারণ করা থাকে না। ফলে দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। অনিবন্ধিত নৌযানের ওপর নিয়ন্ত্রণ না আনলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’
গত রবিবার পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৫০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা বেশি। অনেকে নিখোঁজ রয়েছে। মহালয়া উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে যাওয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকায় করে বোদা উপজেলার বরদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিল উৎসবে যোগ দিতে। দুপুরের দিকে মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাট এলাকায় ইঞ্জিনচালিত নৌযানটি ডুবে যায়। কিছু মানুষ সাঁতরে নদীর তীরে উঠতে পারলেও অনেকে নিখোঁজ রয়েছে।
দেশের নৌপথে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নতুন নয়। প্রতি বছর নদীপথে চলাচল করতে গিয়ে অকালে ঝরে অনেক প্রাণ। গত মার্চে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। এতে ছয়জনের মৃত্যু হয়। এর আগে গত বছর ৩ মে ঘাটে নোঙর করা বালুবোঝাই বাল্কহেডের সঙ্গে শিমুলিয়া থেকে আসা একটি দ্রুতগতির স্পিডবোটের ধাক্কা লাগে। ঘটনাস্থলেই ২৬ জনের মৃত্যু হয়। একই বছরের জুন মাসে বুড়িগঙ্গা নদীতে মর্নিং বার্ড লঞ্চের ওপর এমভি ময়ূর-২ নামের জাহাজ উঠে গেলে লঞ্চটির ৩৪ যাত্রীর প্রাণহানি হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ৯০টি নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় ১৯৮ জনের আর নিখোঁজ হয় ১৮৬ জন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে নৌ-দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩ হাজার ৩৪৫ জন।
দেশে বর্তমানে যেসব নৌপথ রয়েছে, সেসবের বেশিরভাগ অরক্ষিত। এসব নৌরুটে দিকনির্দেশক বাতি ও বয়া নেই। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় তিন হাজার নৌযান চলছে। তবে উপকূল এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন নৌরুটে স্পিডবোট ও ছোট নৌযানের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। নৌযান অনুমোদনহীনভাবে চলছে। তা ছাড়া নৌপথে শৃঙ্খলা রাখতে যে পরিমাণ নৌ-পুলিশ থাকা প্রয়োজন, তা নেই। এসব নৌ-পুলিশকে দৈনন্দিন কাজের জন্য কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেওয়া হলেও তা দিয়ে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
বড় নৌ-দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু সব তদন্ত কমিটিই দুর্ঘটনা রোধে গুচ্ছ গুচ্ছ সুপারিশ করে। এসব সুপারিশ কার্যকর করা হয় না। বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তোলপাড় শুরু হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। বসে থাকে না তদারকি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএও। যত তদন্ত কমিটিই হোক না কেন, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি হওয়ার নজির বিরল।
১৯৭৫ সালের পর দেশে সামরিক শাসন চলাকালে অভ্যন্তরীণ জলসীমায় নিরাপদ ও দূষণমুক্ত নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে ‘দ্য ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর প্রায় ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও পুরনো সেই অধ্যাদেশেই চলছে দেশের নৌপরিবহন। উচ্চ আদালত অধ্যাদেশ থেকে নতুন আইনে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দিলেও তা করতে পারেনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে না পারায় মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের দফায় দফায় কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। নৌপরিবহনসহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের অর্ধশতাধিক অধ্যাদেশ নতুন করে আইনে রূপান্তর করতে না পারায় একাধিকবার সময় বাড়ায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সড়কপথের তুলনায় নৌপথ এখনো পাঁচ গুণ বেশি ঝুঁকিমুক্ত। তবে নৌযান দিন দিন বাড়লেও নৌ-ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নৌরুট ব্যবস্থাপনার কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে নৌপথে ঝুঁকি বাড়ছে। নৌরুটে সিগন্যালিং ব্যবস্থা, রুট আলাদা করা, নৌ-টহল ও নৌ-নিরাপত্তার দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অদক্ষ চালক, নৌপথে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর না করা, চালকদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা, ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল করার সুযোগ পাওয়া এবং বিভিন্ন নৌযানে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করাই নৌ-দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
নদীরক্ষা ও নৌ-নিরাপত্তাসংক্রান্ত গবেষণা সংগঠন ‘নোঙর’-এর প্রধান সমন্বয়ক সুমন শামস বলেন, ‘প্রতি বছর দেশের নৌপথে অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বাণিজ্যিক যেসব রুট রয়েছে তার বাইরেও অসংখ্য নৌরুট রয়েছে। সেসব নৌরুটে ছোট-বড় অসংখ্য নৌযান চলে। প্রতি বছর নৌ-দুর্ঘটনায় অসংখ্য যাত্রী মারা যায়। এসব দেখভালের দায়িত্বে থাকে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু তারা নিয়মিত তদারকি করে না। ফলে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যার মতো বাণিজ্যিক রুটে নৌ-দুর্ঘটনায় শত শত মানুষের মৃত্যু দেখেছি। আমরা এ দুই নদীতে ছোট লঞ্চ বন্ধ করে বিকল্প ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা আমলে নিচ্ছে না। এর দায় বিআইডব্লিউটিএ কোনোভাবে এড়াতে পারে না। মনিটরিং আরও জোরদার করতে হবে। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।’
বিষয়গুলো নিয়ে বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য দফায় দফায় ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
