ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন ঢাবি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় ছাত্রদলের অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ছাত্রদল নেতারা।
জানা গেছে, ঢাবি ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির নেতাকর্মীরা গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন জানিয়ে গত সোমবার একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়। ছাত্রদলের ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কিছু সময় পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ জানায়, তারাও মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিতে যাবে। পরে গতকাল পূর্বঘোষণা অনুযায়ী উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা নীলক্ষেত হয়ে ঢাবি ক্যাম্পাসে ঢোকার সময় তাদের ওপর হামলা চালান ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল দুপুরে ঢাবির বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে মধুর ক্যান্টিনে জড়ো হতে থাকেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে হাজারখানেক নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে যান। শীর্ষ নেতারা উপাচার্যের কক্ষে ঢোকার পর বিভিন্ন হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা তাদের কর্মী নিয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অবস্থান নেন। এসএম হলের কর্মীরা পলাশী মোড়, জগন্নাথ হল শহীদ মিনার, শহীদুল্লাহ, একুশে ও ফজলুল হক হলের কর্মীরা কার্জন হল এলাকা, বঙ্গবন্ধু হল, সূর্য সেন হল, জসীম উদ্দীন হল ও বিজয় একাত্তর হলের কর্মীরা ভিসি চত্বর এলাকায় এবং স্যার এফ রহমান হলের কর্মীরা নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান নেন। এরই মধ্যে বেলা ৪টার দিকে নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার উত্তর ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। সেখান থেকে ছাত্রদলের ১০-১৫ জন নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে ৪টা ২০ মিনিটে ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করেন। মিছিলটি নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সামনে পৌঁছলে এফ রহমান হল ছাত্রলীগের কর্মী সামি প্রথমে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে বাধা দেন। কিন্তু ওই কর্মীর বাধা উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করলে রড ও লাঠি নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। হামলায় নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মুনিয়াত শাহরিয়ার মুনকে। তারা দুজন রড দিয়ে পিটিয়ে ছাত্রদলের এক কর্মীর মাথা ফাটিয়ে দেন।
ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পরে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ছাত্রলীগের হামলায় তাদের ১০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানানো হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা চলে যাওয়ার পর নীলক্ষেত মোড়ে আসেন কবি জসীম উদ্দীন হল শাখা ছাত্রলীগ ও বিজয় একাত্তর হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ধাওয়া করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার পর এ দুই হলের নেতাকর্মী ও এফ রহমান হলের নেতাকর্মীরা নীলক্ষেতের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ১৫ মিনিটের মতো বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাসের দিকে চলে যান তারা।
হামলার বিষয়ে ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অতর্কিত হামলা করে। এতে আমাদের ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তারা ঢাকা মেডিকেল ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।’
তবে ছাত্রলীগের দাবি তারা কারও ওপর হামলা চালায়নি। ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস বলেন, ‘ছাত্রদলের ওপর হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী নয়। তাদের মধ্যে ছয়টি গ্রুপ আছে। তারা যখন স্মারকলিপি প্রদান করতে আসছিল তখন তাদেরই একটা গ্রুপ জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হামলা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করা।’
এদিকে হামলার প্রায় ২০ মিনিট পর ঘটনাস্থলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর একেএম গোলাম রাব্বানী। এ সময় সেখানে দাঁড়িয়ে হামলার বিষয়ে ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখা যায় তাকে। হামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা না বলেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
ছাত্রদলের ওপর ছাত্রলীগের হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের অতিথি হিসেবে মনে করি না। আমরা তাদের অভিভাবক হিসেবে আমাদের সন্তানের মতো দেখাশোনা করি। সব ছাত্রসংগঠন আমাদের কাছে সমান। ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি মূল্যবোধ গড়ে উঠুক আমরা চাই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সবার সঙ্গে যেন সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে সেই শিক্ষা দিই।’
