জাতীয়তাবাদীদের শাসন, সমাজতন্ত্রীদের বিভেদ

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০৫ এএম

বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা কী? প্রশ্নটির সহজ উত্তর, ‘রাজনৈতিক’। রাজনৈতিক সমস্যা অস্বীকার করা যাবে না। পাশাপাশি বহু নিপীড়নমূলক সমস্যার জালে দেশবাসী জড়িয়ে পড়েছে। সেসব সমস্যাও অগুরুত্বপূর্ণ নয়। সব সমস্যার মূলেই রাজনৈতিক সমস্যা; সেটা স্বীকার করতেই হবে। রক্তাক্ত একাত্তরের বিজয়ের পর কেটে গেল পঞ্চাশ বছর। যুদ্ধ শেষে দেশবাসী যে স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার পূর্ণতার সম্ভাবনা দেখেছিল আমাদের জাতীয়তাবাদী শাসকরা, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলেছে। জনগণ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে মুক্তি পাবে বলে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। বাস্তবে জনগণের সেই কাক্সিক্ষত স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। সাবেকি ব্যবস্থা তো বদল হলোই না। বিপরীতে আরও আঁটসাঁট বেঁধে গণবিরোধী সেই ব্যবস্থা জাতির স্কন্ধে জগদ্দল পাথরের ন্যায় চেপে বসেছে। শাসক বদল ছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্র অপরিবর্তিত থাকায় রাষ্ট্রের চরম প্রতিপক্ষ এখন জনগণ। যদিও আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিকানা জনগণের ওপর ন্যস্ত। বাস্তবতা ঠিক বিপরীত। জনগণ এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাধীনে প্রজা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। তাই প্রজা শোষণ চলছে অবিরাম, অব্যাহত গতিতে।

স্বাধীন রাষ্ট্রে সাবেকি ব্যবস্থার অধীনে জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক অধিকার কোথায় সুরক্ষা পেয়েছে? মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে জাতীয়তাবাদীদের প্রয়োজন-গুরুত্ব দুই-ই ফুরিয়েছিল। দেশ ও জনগণের স্বপ্নপূরণে জাতীয়তাবাদীদের ব্যর্থতা এবং সমাজতন্ত্রের অভিমুখে অগ্রযাত্রায় সব সম্ভাবনাকে পিষ্ট করে জাতীয়তাবাদীরা শাসনক্ষমতার লাগাম নিজেদের অধীনে টেনে ধরে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষারই কবর রচনা করেছে। শোষণ-বঞ্চনার শিকার দেশবাসী ধারাবাহিকভাবে ৫০ বছর ধরে শোষণ-নিপীড়নের শিকার হয়ে এসেছে। ক্ষমতা এবং একমাত্র ক্ষমতা পেয়েই জাতীয়তাবাদীরা মহানন্দে দেশ-জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার তোয়াক্কা না করে শ্রেণি স্বার্থকে প্রধান করে তুলেছে। আমাদের পেটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতার বদৌলতে নানা ঘৃণিত পন্থায় অর্থ-বিত্তের বৈভবে বুর্জোয়ায় পরিণত হয়েছে সত্য। তবে বুর্জোয়া ব্যবস্থাধীনে যে প্রক্রিয়ায় বুর্জোয়াদের বিকাশ ঘটে আমাদের দেশে কিন্তু সে রূপে বুর্জোয়া বিকাশ ঘটেনি। লুণ্ঠন, দখলদারি এবং সীমাহীন দুর্নীতির আশ্রয়ে শাসক শ্রেণির ছাতার নিচে নিরাপদ আশ্রয়ে আমাদের দেশে বুর্জোয়া বিকাশ ঘটেছে। যাদের অনায়াসে লুণ্ঠনকারীই বলা যায়।

রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ঘটেনি বলেই সেই সমস্যা ক্রমেই বহু সমস্যার জন্ম দিয়েছে। আর সব সমস্যার খেসারত দিয়ে যাচ্ছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। আমাদের শাসকশ্রেণি মাত্রই জাতীয়তাবাদী রূপে নিজেদের অভিহিত করে থাকে। নির্বাচিত এবং উর্দিধারী প্রতিটি শাসকই নিষ্পত্তি হওয়া তথাকথিত জাতীয়তাবাদের মোড়কে-আশ্রয় নিয়েছে। একাত্তরে জাতীয়তাবাদীদের প্রয়োজনীয়তা শেষ হলেও ক্ষমতার জোরে জাতীয়তাবাদের রক্ষাকবচ ঢাল শাসকদের প্রত্যেকের কাছে শোভা পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে মৌলিক অবস্থানে তাদের ভিন্নতা নেই। অথচ প্রকৃত জাতীয়তাবাদী মাত্রই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। কিন্তু আমাদের জাতীয়তাবাদী শাসক দলগুলো চরমভাবে সাম্রাজ্যবাদের আনুগত্যের নজির স্থাপন করেছে। দেশ-জনগণের এবং জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছে; সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিনিধি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে। এই হেন ও হীন জাতীয়তাবাদী নামধারী শাসকগোষ্ঠী পৃথিবীতে কমই দেখা যাবে। সাম্রাজ্যবাদীদের অনুগ্রহ পেতে পরস্পর প্রতিযোগিতায় পর্যন্ত লিপ্ত। কে কত বেশি আনুগত্যে দেশের স্বার্থ বিকোতে সক্ষম এ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের সামান্য দ্বিধা সংকোচ নেই।

সম্প্রদায়গত চেতনায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধীনতা বরণ করে নেওয়া তৎকালীন পূর্ববাংলার মানুষের দ্রুতই স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছিল। তেইশ বছরের লাঞ্ছনা-বঞ্চনার অবসানে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, আত্মদানে পাকিস্তানি সামরিক শক্তিকে পরাভূত করে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলো তার প্রধান ও একমাত্র উপলক্ষ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা। অথচ সম্প্রদায়গত চেতনা ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার চেতনায় এই ভূখণ্ড দুবার স্বাধীন হলেও, জনগণের মুক্তি অর্জন অধরাই রয়ে গেছে। সম্প্রদায় এবং জাতীয়তা আমাদের মুক্তি দিতে ব্যর্থ সেটা তো প্রমাণিত। সশস্ত্র বিজয় অর্জনের পর সমাজতন্ত্রের অভিমুখে আমাদের অগ্রযাত্রার সম্ভাবনা অঙ্কুরেই ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদীরা বিনাশ করে জাতির অগ্রযাত্রাকে নষ্ট করেছে। সমাজতন্ত্রের পথেই আমাদের মুক্তি লাভ সম্ভব। অন্য কোনো উপায়ে যে নয়; তা-বারবার প্রমাণিত হয়েছে। অথচ সমাজতন্ত্রের উপযোগী-উর্বর এই দেশে সমাজতন্ত্রের বিকাশ লাভ সম্ভব হলো না। কেন হলো না? এ প্রশ্নও অমূলক নয়।

সমাজতন্ত্রের অভিযাত্রায় সমাজতান্ত্রিক দল-সংগঠনের গুরুত্ব সর্বাধিক। সমাজতান্ত্রিক দলের পক্ষেই সম্ভব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে অগ্রগামী করে তোলা। জনগণকে আন্দোলনের পক্ষে এককাতারে নিয়ে আসা। আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক দলের তালিকা ক্ষুদ্র নয়। বরং তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু সাংগঠনিক আকারে-আয়তনের ক্ষেত্রে হতাশাজনক পরিস্থিতি বিরাজমান। এক ব্যক্তি বিশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক দলও দেশে রয়েছে। কেউ চ্যালেঞ্জ করলে প্রমাণ দেওয়াও অসাধ্য নয়। প্রশ্ন থেকে যায়, সবার লক্ষ্য যদি জনগণের মুক্তিই হয়ে থাকে; তবে কেন এই বিভক্তি? প্রকৃত কারণটি আমার ক্ষুদ্র চিন্তায়এক, আমাদের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্ব মধ্যবিত্তের শ্রেণি-চেতনায় নিমজ্জিত। তারা শ্রেণিচ্যুত হতে পারেনি। দুই, নেতৃত্বের লোভে দল ভেঙে দল গড়ার প্রবণতাও প্রবলভাবে দৃশ্যমান। নিজে দলনেতা হওয়ার অভিলাষে দল ভাঙে-গড়ে। দলের শক্তিমত্তার প্রশ্নে নির্লজ্জতা তাদের চিন্তাজগতে সামান্যতম রেখাপাত করে না। তিন, জনসম্পৃক্ততার বিপরীতে জনবিচ্ছিন্ন প্রবণতাকেও দায়ী করা যায়। দোকান খুলে পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করার ন্যায় অফিস ভাড়া করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ব্যাঙের ছাতার ন্যায় দেশে সমাজতান্ত্রিক দলের তালিকা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সংকীর্ণ বৃত্তে হাবু-ডুবু খাচ্ছে। আন্দোলনের কর্মপন্থাসহ ক্ষুদ্র বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারেসেটা বৃহত্তর ক্ষেত্রে বা প্রধান বিষয়ে নিশ্চয় নয়। কিন্তু ক্ষুদ্র মতপার্থক্য এড়িয়ে বৃহত্তর বাম আন্দোলন গড়ে তোলা অসম্ভবও নয়।

আমাদের বামপন্থিদের একটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে; আমাদের শাসক বুর্জোয়া দল কখনো বামপন্থিদের শত্রু ছাড়া বন্ধু নয়। দক্ষিণপন্থিদের বন্ধু ভাবা মানেই সমাজ বিপ্লবের চরম শত্রুদের কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ করা। এমন আত্মসমর্পণকারী কোনো বাম দলই প্রকৃত বামপন্থি নয়। তারা ডানপন্থিদের চেয়েও অধিক প্রতিক্রিয়াশীল। আমাদের পতিত বামদের শাসক দলে যুক্ততায় বাম আন্দোলনের ক্ষতি নিশ্চয় হয়েছে। তবে পতিতদের শেষ সীমা ওই পর্যন্তই তার বেশি নয়। ওখানেই তাদের সলিলসমাধি।

বিভেদ-মতপার্থক্য এড়িয়ে মতাদর্শিক ঐক্যেই সমাজ বিপ্লব সম্ভব। যারা নিজেদের বিপ্লবী-সমাজতন্ত্রী মনে করেন; তাদের সমাজ বিপ্লবে দ্বিধা থাকলে তো সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের ভবিষ্যৎ আলোর পথে কখনো অগ্রসর হবে না। জাতীয়তাবাদী ডানপন্থি-ধর্মান্ধ মৌলবাদী অপশক্তি যূথবদ্ধভাবেই শাসনক্ষমতায় নিরঙ্কুশ থাকবে। এদের পরাভূত করার জন্য নিজেদের প্রস্তুতির প্রধান লক্ষ্য মতাদর্শিক ঐক্য। এই ঐক্যই শাসক শ্রেণিকে পরাভূত করে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ সমতার বাংলাদেশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। আমরা দেশপ্রেমিক সেই শক্তিসমূহের ঐক্য প্রত্যাশা করি। প্রত্যাশা করি বিদ্যমান ব্যবস্থা বদলে জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রকৃত মুক্তি। সেই মুক্তি না-ঘটলে আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থার জাঁতাকলে পেষণের হাত থেকে মুক্তির আর উপায় থাকবে না।

বিপ্লবে আস্থাবান, মতাদর্শে অবিচল বৃহত্তর বাম ঐক্যেই বিদ্যমান অপব্যবস্থার বদল সম্ভব। ভোটের রাজনীতি অনিবার্যরূপে শাসক শ্রেণির রাজনীতি। সে রাজনীতি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার নয়। ক্ষমতার হাত বদলের রাজনীতি। সেটাও তথাকথিত জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া দলের অর্থ, পেশিশক্তি, রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় দল ও শ্রেণির ক্ষমতা লাভের রাজনীতি। জনগণের ভোটের প্রয়োজন ছিল; এখন সেটিরও প্রয়োজন নেই। ক্ষমতায় থেকে ভোট বা নির্বাচন প্রহসনের নাটক চলছে দেশের প্রতিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনে অতীতে কিংবা অদূর ভবিষ্যতে জনগণের মুক্তি আসেনি। আসবেও না। একমাত্র বিকল্প পথটি হচ্ছে জনসম্পৃক্ত সমাজ বিপ্লব। সে পথটিই জনগণের মুক্তির একমাত্র পথ। সে পথেই বামপন্থি-সমাজতন্ত্রীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তার আগে চিনতে হবে প্রকৃত শত্রু এবং মিত্রকে। শত্রু-মিত্র চেনার ক্ষেত্রে ভুল করলে সমাজ বিপ্লব কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। তাই ঐক্য যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি শত্রু ও মিত্র চিহ্নিতকরণও।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক নতুন দিগন্ত

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত