আগামী শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। ৫ অক্টোবর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সারা দেশে ম-পের সংখ্যা বেড়েছে। ৩২ হাজার ১৬৮ ম-পের মধ্যে ৭৯১৭টি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছর একাধিক মন্ডপে হামলার ঘটনাকে সামনে রেখে এবার প্রতিটি মন্ডপে কঠোর নিরাপত্তার বলয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। প্রায় এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও র্যাব পূজা উদযাপন কমিটির নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে নিরাপত্তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেসব স্থানে মন্ডপ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ আছে তা দ্রুত মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর এ নিয়ে একটি গোপন প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনে নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে পূজা উৎসবকে কেন্দ্র করে পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপাররা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। জঙ্গিদের বিষয়ে কঠোর মনিটরিং করতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট দিলেই গ্রেপ্তার করতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ মন্ডপগুলোতে বাড়তি নজরদারির পাশাপাশি একাধিক সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে গেট স্থাপন করতে বলা হয়েছে। মন্ডপে যারা দায়িত্ব পালন করবে তাদের ছবিসহ যাবতীয় তথ্য স্থানীয় থানায় জমা দিতে বলা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের পূজায় কঠোর নিরাপত্তার বলয় থাকবে। থানা পুলিশের পাশাপাশি কমিউনিটি ও বিট পুলিশের সঙ্গে পূজা কমিটি সমন্বয় করে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এই সময়ে সারা দেশে তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুরো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে। মন্ডপ নিয়ে কোনো ধরনের বিরোধিতা নেই। তারপরও আমরা বিষয়টি আমলে নিয়েছি। পুলিশ যেভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছে সেভাবে আমরা কাজ করছি। সরকার থেকে নিরাপত্তার ব্যাপারে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রতি বছরই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজা ম-পের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০০৯ সালে মন্ডপ ছিল ২১৯১৩টি, ২০১০ সালে ২৩৪৪০টি, ২০১১ সালে ২৮০০০টি, ২০১২ সালে ২৭৮০৭টি, ২০১৩ সালে ২৮২৪৪টি, ২০১৪ সালে ২৮০৮৩টি, ২০১৫ সালে ২৮৩৬৩টি, ২০১৬ সালে ২৯০৭০টি, ২০১৭ সালে ২৯২২৫টি, ২০১৮ সালে ৩০১৬০টি, ২০১৯ সালে ৩১০৯১টি, ২০২০ সালে ৩০৭১০টি, ২০২১ সালে ৩১৫০৭টি ও ২০২২ সালে ৩২১৬৮টি মন্ডপ আছে।
প্রতি বছরই মন্ডপ নিয়ে একটি মহল নানাভাবে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করে। সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা হয়েছে গত বছর। ওই বছর কুমিল্লা, রংপুর, নোয়াখালী, চাঁদপুরসহ দেশের অন্তত ১৮টি জেলায় মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। বেশ কয়েকজন মারাও গেছেন। গত বছরের ঘটনার বিষয়টি মাথায় রেখে এবার নিরাপত্তার ব্যবস্থা আলাদাভাবে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় এক মাস ধরে পূজামন্ডপ নিয়ে আমরা কাজ করেছি। এই সময়ে দেখা গেছে, মন্ডপের স্থান ও কমিটি গঠন নিয়ে কোনো কোনো স্থানে বিরোধ তৈরি হয়েছে। এসব নিয়ে আমরা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছি। দুই/এক দিনের মধ্যে বিরোধ মিটাতে উদযাপন কমিটির নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিরোধকে পুঁজি করে তৃতীয় পক্ষ সুবিধা নিবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এমনকি জঙ্গি ও একটি মহল সুবিধা নিতে পারে। তারপরও আমরা সতর্ক আছি।’ তিনি বলেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তার বলয় তোলা হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি প্রতিবেদন করা হয়েছে। রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। তারা নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন। ঝুকিপূর্ণ যেসব ম-প আছে সেখানে আলাদাভাবে নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। যেসব মন্ডপে আমাদের নির্দেশনা মানবে না উল্টো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ঝুঁকিপূর্ন মন্ডপগুলোর মধ্যে ঢাকায় ৮৯টি, চট্টগ্রাম শহরে ১২৫টি, রাজশাহী শহরে ২৬টি, খুলনা শহরে ৪৫টি, বরিশাল শহরে ২০টি, সিলেট শহরে ৫৩টি, গাজীপুর মেট্রোতে ২১টি, রংপুর শহরে ১৯টি, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জে ১৭০৪টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৫৫৯টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৯৮৮টি, রংপুর রেঞ্জে ১১৪২টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১০৮০টি, খুলনা রেঞ্জে ১০৮৯টি, বরিশাল রেঞ্জে ৫২৯টি ও সিলেট রেঞ্জে ৪২৮টি মন্ডপ রয়েছে। এর মধ্যে এবার সর্বোচ ৭১৮১টি মন্ডপ আছে ঢাকা রেঞ্জে। আর কম মন্ডপ আছে বরিশাল শহরে ৮৫টি। পুলিশের গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পূজা শুরুর আগে মন্ডপকেন্দ্রিক বিরোধ নিষ্পতি করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করতে হবে।
