দেশে এক ধরনের দুষ্ট রাজনীতির চর্চা রয়েছে

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:৫৯ এএম

‘বাংলাদেশে এক ধরনের দুষ্ট রাজনীতির চক্র আছে, তারা ভবিষ্যতেও থাকবে। সেই শ্রেণির মানুষরা নষ্ট রাজনীতির দুষ্টচর্চায় অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে আমাকে কেউ পক্ষে আবিষ্কার করেছে। আবার কেউ আমাকে বিপক্ষে আবিষ্কার করেছে। আজ তাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অনুযোগ নেই, কোনো অভিযোগ নেই। আপনারা ভালো থাকবেন এ কামনা করি। এ দেশ আমার, আপনার সবার। দেশকে সবার আগে ভালোবাসতে হবে’ এ কথা বলেন পুলিশের বিদায়ী মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ অডিটরিয়ামে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, ‘ডিএমপি কমিশনার, র‌্যাবের ডিজি ও আইজিপি হিসেবে পুলিশের শীর্ষ পদে ১২ বছর দায়িত্ব পালনকালে সব ভালো কাজের ক্রেডিট সরকার ও জনগণের আর ব্যর্থতার দায় আমার।’

আজ শুক্রবার আইজিপি বেনজীর আহমেদ পুলিশ বাহিনীতে প্রায় সাড়ে ৩৪ বছরের কর্মজীবন শেষ করবেন। অবসরে যাওয়ার আগে নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের নানা অর্জন সম্পর্কে এবং প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। ধন্যবাদ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দেশের জনগণকে।

চাকরিজীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়ে জানতে চাইলে বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘সব চ্যালেঞ্জই চ্যালেঞ্জ। যতক্ষণ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম না করতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটাই চ্যালেঞ্জ। আপনারা মনে করতে পারছেন কি না, ফরমালিনের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলাম। ম্যাজিস্ট্রেটদের সহযোগিতা নিয়ে শত শত টন ফরমালিন মেশানো মাছ-মাংস-ফল-সবজি ধংস করে জাতিকে ফরমালিনমুক্ত খাবার উপহার দিয়েছি। ওই সময়ে দেশে বছরে প্রায় ৭০০ টন ফরমালিন আমদানি হতো। এখন আমদানি হয় কমবেশি ১০০ টন। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা ছিল আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা প্রায় ৪০০ বছরের। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪০ বছর পর্যন্ত দস্যুরা সুন্দরবনে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। সুন্দরবনে যারা জীবিকা নির্বাহ করত, তারা দস্যুদের কাছে জিম্মি ছিল। মৌসুমের সময় নিয়মিত অপহরণ করত সাধারণ মানুষকে। আমরা তিন ডজন ডাকাতকে আত্মসমর্পণ করিয়েছি। এই ১২ বছরে যা কিছু ভালো হয়েছে, তার ক্রেডিট সরকারের এবং বাংলাদেশের মানুষের। ব্যর্থতা থাকলে সেগুলোর দায় ডেফিনিটলি আমার। কারণ, সেসব ক্ষেত্রে হয়তো রাষ্ট্রের দায়িত্ব আমি ঠিকমতো প্রতিপালন করতে পারিনি।’

দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, ‘এটাকে সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠি হিসেবে বরং না দেখি। আমি দেখতে চাই, অর্জন কতটা হয়েছে আর অর্জনের কী বাকি আছে। অর্জনের বিষয়টা একটা প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া কখনো শেষ হওয়ার নয়। আমি দৌড়েছি, এখন আমার সহকর্মীর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরিত হলে তিনি দৌড়াবেন। থিউরি অব পারফেকশন বলে, পৃথিবীতে কিছুই পারফেক্ট নয়। মানুষের মানবিক সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের যা কিছু করতে হয় মানবিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই করতে হয়।’

কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরাম নিহত হওয়ার সময় র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন ড. বেনজীর আহমেদ। একরামের নিহত হওয়ার ঘটনা তাকে অনুতপ্ত করে কি না জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, ‘বিষয়টি একটি লিগ্যাল ইস্যু। যে পর্যন্ত বিষয়টি অন্যায্য বা অনৈতিক প্রমাণিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ বিষয়ে আমার অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ নেই। ঘটনাটি আমার ব্যক্তিগত ক্যাপাসিটিতে ঘটেনি, ঘটনাটি ঘটেছে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার ফিল্ড লেভেলের লোকজনের মাধ্যমে। যে ভদ্রলোক নিহত হয়েছেন, তার সঙ্গে ওখানকার মাঠপর্যায়ের লোকজনের ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ ছিল না। তাই বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আমরা একটি বিষয় দেখি, আমাদের কোনো সহকর্মী দায়িত্বের বাইরে গিয়েছে কি না। কেউ যদি দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একরামের বিষয়েও একাধিক তদন্ত হয়েছে।’

পুলিশের মধ্যে মানবাধিকারের উন্নয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশকে মানবাধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেবে বলে এ দেশের এনজিওগুলো শত শত কোটি টাকা নিয়ে এসেছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে। এসব টাকা আমরা আনিনি, এনেছে এনজিওগুলো পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। এনজিও কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, তবে যখনই তারা ডেকেছে, পুলিশ গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে। পুলিশকে মানবাধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ সবসময় দেওয়া হয়। এ ছাড়া সরকার থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে।’

অবসরে যাওয়ার পর কী করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আজ পর্যন্ত দায়িত্বে আছি। অবসর নেব আগামীকাল (আজ)। পরে অবসর নিয়ে ভাবব। তবে অবসরের পর এ সমাজের অংশ হিসেবে মানুষের সঙ্গে বাস করব বাকি সারাটা জীবন। দেশের মানুষের অনেক অবদান রয়েছে আমার প্রতি, আমি চেষ্টা করব জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের পাশে দাঁড়াতে।’

অনেকে বলেন বেনজীর আহমেদ চাকরিজীবন শেষে রাজনীতিতে আসবেন, তিনি রাজনৈতিক নেতাদের মতো বক্তব্য দেন এমন প্রশ্নের জবাবে বিদায়ী আইজিপি বলেন, ‘আমি তো এমন কথা কখনো বলিনি। অন্যের বক্তব্যের বিষয়ে আমি কোনো উত্তর দিতে আগ্রহী নই।’

বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে অনেক সময় মানুষ মারা যায়, এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। আমাদের প্রাথমিক এবং প্রধান লক্ষ্য থাকে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য। এর জন্য আমাদের হাতে অস্ত্র থাকে। এসব ঘটনার বিষয়ে নির্বাহী ও বিভাগীয় তদন্ত হয়।’

আইজিপি বলেন, ‘আমার ৩৪ বছর ৫ মাস ১৬ দিনের কর্মজীবনের মধ্যে ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১২ বছর পুলিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে দায়িত্ব পালন করেছি। ডিএমপি কমিশনার, র‌্যাব ডিজি ও সর্বশেষ আইজিপির দায়িত্ব। অনেক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আপনারা সমর্থন জুগিয়েছেন, দেশবাসীও সমর্থন জুগিয়েছে। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দায়িত্ব পালনকালে চেষ্টা করেছি মানুষের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। চাকরির শেষ দিন মানে আগামীকাল থেকে জীবনের একটি পাতা উল্টিয়ে নতুন পাতা পড়ার চেষ্টা করব। তার মানে আগামীকাল থেকে দেখা হবে না, কথা হবে না এমনটি নয়। সামাজিক জীব হিসেবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে, যেখানেই সুযোগ পাব একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করব।’

আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশ পুলিশের দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কীভাবে আমরা সফলভাবে করোনা ক্রাইসিস অতিক্রম করেছি এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশ পুলিশের সাফল্য। কিছুদিন আগে জাতিসংঘের কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে, আমরা কীভাবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সফল হয়েছি।’

অবসরে নিরাপত্তা : আজ অবসরে যাবেন আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ। এ সময়ে তার দায়িত্বে থাকবে একটি এসকর্ট গাড়িসহ পুলিশের ছয়জন সদস্য। তার বাসায় নিরাপত্তা দেবেন একজন এএসআইসহ তিন কনস্টেবল। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো আইজিপি অবসরে যাওয়ার আগে মন্ত্রণালয়ে যদি আবেদন করেন তাহলে সিকিউরিটিসহ সব ধরনের সুবিধা পান। সাবেক আইজিপি শহীদুল হকও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশি সহায়তা পেয়েছেন। তবে সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী পুলিশ চেয়ে আবেদন করেননি। বেনজীর আহমেদ অবসরকালীন এক বছর এ সুবিধা পাবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত