সিপিডির অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা

উদ্যোক্তাদের প্রধান বাধা সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০২:০১ এএম

একজন উদ্যোক্তা ছোট একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে বছরের পর বছর কেটে যায় শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দুর্নীতির কারণে। সামান্য কাজেও সরকারি কর্মকর্তারা যে পরিমাণ হয়রানি করেন তাতে ছোট উদ্যোক্তারা তো মনোবল হারানই, বড় শিল্প উদ্যোক্তারাও বিপাকে পড়েন।

গতকাল রবিবার রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সেটিং আপ এ ফ্যাক্টরি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ব্যবসায়ী নেতারা।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান, বিশেষ অতিথি ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মো. মোয়াজ্জেম, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্সের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বিটিএমইএর সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন, বিল্ডের প্রধান নির্বাহী ফিরদাউস আরা বেগমসহ অন্যরা। সিপিডির উদ্যোগে ‘ফ্যাক্টরি সেটআপবিডি ডট কম’ নামে ওয়েবসাইট সম্পর্কে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির রিসার্স অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মোয়াজ্জেম বলেন, ‘শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দুর্নীতি ও হয়রানির কারণে বছরের পর বছর কেটে যায় একটা কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু এসব কর্মকর্তার ঘুষ-দুর্নীতির পরও দেশ এতদূর এগিয়েছে শুধু ব্যবসায়ীদের সাহসের কারণে। এ দেশের ব্যবসায়ীরা এত কষ্ট করে ব্যবসা করছেন, তা পৃথিবীতে বিরল।’

তিনি বলেন, ‘দেশের দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কৃষিমন্ত্রী আমাকে বলেন, আপনাদের সিন্ডিকেট যেহেতু ডিমের দাম বাড়াতে পারে তাহলে আরেকটি সিন্ডিকেট করে আলুর দামটা বাড়িয়ে দেন, কৃষকদের উপকার হয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রতি বছর শত শত সভা-সেমিনার করে কিন্তু সেখানের সরকারি অফিসগুলোর ডেস্ক অফিসারদের অংশগ্রহণ থাকে না। এতে ফলাফল শূন্য হয়। তাদের অংশগ্রহণ জরুরি। ছোট ছোট ব্যবসায়ী গড়ে তোলার জন্য ১৮ জন উপদেষ্টা নিয়েছে এফবিসিসিআই। গত চার বছর আমরা কাজ করতে পারিনি, কিন্তু এখন আমরা শুরু করেছি।’

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সিপিডির এ ধরনের ওয়েবসাইট নির্মাণের উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া দরকার ছিল। কারণ কীভাবে কারখানা করতে হয় তা না জানার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা নানা হয়রানির শিকার হন। শুধু ফাইল দুর্নীতি নয়, ডকুমেন্টশনের বাইরে নন-ডকুমেন্টশনে যে দুুর্নীতি তাতে টিকে থাকা কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কি এখন নেই? আমরা বিইআরসির সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম এক মেগাওয়াট জেনারেটর বা তার ওপরে হলে রেজিস্ট্রেশন লাগবে। কিন্তু তাদের অডিট টিম এসে ৫০০ কেবির জেনারেটরের জন্যও কাগজ চায়। তারা টাকা ছাড়া নড়েই না।’

বিকেএমইএর সভাপতি দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে বিসিকের রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার জন্য আমার এক ছোট ভাই আইআরসি করবে। তিনি আবেদনের এক মাসেও না পাওয়ায় আমার কাছে এসেছিল। তার কাছে নাকি প্রত্যয়নপত্রের জন্য ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চাচ্ছে। আমি বিসিকের ডিরেক্টরকে ফোন দিলে তিনি তখনই সই করে দেন। কিন্তু তারপরও কর্মকর্তারা ফাইল ছাড়েন না। তাদের দাবি, ডিরেক্টরের ফি ২০ হাজার, তিনি তো নেবেন না পরিচিত দেখে, আমাদের ফি ৩০ হাজার না দিলে ফাইল ছাড়ব না।’

বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘আমাদের হয়রানির অভাব নেই। নতুন করে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়ে জানাল সাব-সিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে। এটাও এক ধরনের হয়রানি। কিন্তু আমরাই ফরেন কারেন্সি ধরে রাখার জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। দেশের রিজার্ভ এখন ৩৬ বিলিয়ন ডলারে। এটি আরও কমবে। দুই মাস আগে থেকেই আমরা বলে আসছি আমাদের পোশাক রপ্তানি কমবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সমস্যা পাওয়ার সেক্টর নিয়ে। ক্রেতাদের অর্ডার ডেলিভারি করতে পারছিলাম না বিদ্যুতের অভাবের কারণে। কিন্তু এ সময় আমাদের আরও প্রশ্নের জবাব দিতে হয় মার্কেটে পোশাক খাতের শেয়ার কেন কমছে, তার জবাবদিহিতা করতে করতেই সময় পার হয়, আমরা বাকি কাজ করব কখন।’

এ সময় নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘সদ্য প্রয়াত অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পদত্যাগ করেছিলেন শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে। আমাদের সমস্যা দুটি, গো ফরোয়ার্ড, এরপরই আবার গো ব্যাকওয়ার্ড। দেশের রপ্তানিকারকদের এক নম্বর সমস্যা কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড লাইসেন্স।’

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যত গতিশীল হবেন, দেশের উন্নয়নও তত গতিশীল হবে। তাদের অবদানে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।’

সিপিডির উদ্যোগে তৈরি করা এ ওয়েবসাইটে পোশাক খাত, ওষুধ খাত, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, চামড়া শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, নিবন্ধন ও সার্টিফিকেশন কীভাবে করা যাবে তার বিস্তারিত জানতে পারবেন উদ্যোক্তারা। তাছাড়া আটটি ক্যাটাগরিতে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জানা যাবে এ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত