কুয়েতপ্রবাসী এক বাংলাদেশি গত ২ সেপ্টেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। পরে বগুড়া যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দর থেকে প্রাইভেট কারে প্রথমে উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ডে যান। সেখানে উত্তরবঙ্গগামী বাসের টিকিট কিনতে কাউন্টারে যাওয়ার সময় আরেক ব্যক্তি নিজেকে প্রবাসী পরিচয় দিয়ে জানান, তার কাছে বগুড়ার একটি অতিরিক্ত টিকিট আছে। তিনিও চাইলে সেটি নিতে পারেন। ওই ব্যক্তির কাছে ব্যাগপত্র ও বিদেশি মুদ্রা দেখে কুয়েতপ্রবাসী তাকে বিশ্বাস করেন ও টিকিট কিনে নেন। পরে তারা বাসে বসেন পাশাপাশি আসনেই। বাস ছাড়ার পর ওই ব্যক্তির দেওয়া বিস্কুট খেয়ে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। পরে তার পরিবারের সদস্যরা যখন তাকে উদ্ধার করেন তখন তার সঙ্গে আনা কোনো জিনিসপত্রই ছিল না। বাসের শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তার পাশের আসনে বসা যাত্রীই সব নিয়ে সিরাজগঞ্জে নেমে গেছেন।
ওই ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় ভুক্তভোগী ওই প্রবাসীর করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে র্যাব বিমানবন্দর এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায়। অবশেষে গত শনিবার রাতে চক্রটির হোতা মো. আমির হোসেনসহ (৫২) চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। গ্রেপ্তার অন্যরা হলোÑ লিটন মিয়া ওরফে মিল্টন (৪৮), আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে পারভেজ (৩৫) ও জাকির হোসেন (৪০)। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় মোবাইল, অজ্ঞান করার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম, যাত্রীর ছদ্মবেশ ধারণে ব্যবহৃত লাগেজ ও চোরাই স্বর্ণ।
র্যাব জানিয়েছে, চক্রটি সদস্য সংখ্যা ৮-১০ জন। তারা গত ১৫ বছরে প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগীকে অজ্ঞান করে তাদের কাছ থেকে মূল্যবান মালামাল লুট করেছে। চক্রের মূলহোতা আমিরের বিরুদ্ধে অজ্ঞান ও মলম পার্টিসংক্রান্ত ১৫টিরও বেশি মামলা রয়েছে।
গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান। র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, ব্যাংকপাড়ায় সাধারণ যাত্রীদের, ব্যাংকে আসা গ্রাহকদের টার্গেট করে থাকে। চক্রটি বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের টার্গেট করার লক্ষ্যে বিমানবন্দরের টার্মিনালে হাতে পাসপোর্ট ও লাগেজ নিয়ে প্রবাসফেরত যাত্রীর ছদ্মবেশ ধারণ করত। এটি মূলত তাদের একটি কৌশল। বিদেশফেরত যেসব ব্যক্তির কোনো স্বজন বিমানবন্দরে আসেন না এবং নিজস্ব গাড়ি নেই তাদের টার্গেট করে চক্রটি। তারা কৌশলে বিদেশফেরত ব্যক্তির সঙ্গে কুশল বিনিময় করে চক্রের অন্য সদস্যদের নিকটাত্মীয় বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। পরে একই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত হয়ে তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য রাজি করাত। তারা একসঙ্গে বাসের টিকিট কেটে যাত্রা শুরু করত। ভ্রমণের সময় চক্রের সদস্যরা কৌশলে চেতনানাশক ওষুধ মিশ্রিত বিস্কুট খাইয়ে ভুক্তভোগীদের অচেতন করত। এরপর প্রবাসীর সঙ্গে থাকা লাগেজের টোকেনের মাধ্যমে বাস থেকে মালামাল নিয়ে চক্রটি পরবর্তী স্টেশনে নেমে যেত।
গ্রেপ্তারদের বিষয়ে তিনি বলেন, চক্রের হোতা আমির বিমানবন্দর এলাকায় ফাস্টফুডের দোকানে চাকরির আড়ালে গত ১৫ বছর ধরে এসব অপরাধ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, চক্রে আরও ছয়-সাতজন বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে অনেকে বর্তমানে কারাগারে। এ ছাড়া ১৫টি মামলার আসামি আমির র্যাব ও পুলিশের হাতে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছে। পরে জামিনে মুক্ত হয়। মূলত লুট করা টাকার একটি অংশ সে জামিনসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যয় করে। আমিরের সহযোগী গ্রেপ্তার লিটন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। পরে সে মাইক্রোবাস চালানো শুরু করে। এর আড়ালে তিন-চার বছর ধরে আমিরের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছিল লিটন। সেও একাধিকবার একই ধরনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়। এ ছাড়া গ্রেপ্তার আবু বক্কর আট-নয় বছর বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানে কর্মরত ছিল। পরে গত ছয়-সাত বছর আগে নিজেই রাজধানীর শ্যামপুরে জুয়েলারির দোকান প্রতিষ্ঠা করে। জুয়েলারি দোকানের আড়ালে গত দুই-তিন বছর ধরে এ চক্রের লুট করা স্বর্ণ গ্রহণ, রূপ পরিবর্তন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। গ্রেপ্তার জাকির হোসেন ছাপাখানার ঠিকাদার হিসেবে কর্মরত। গত তিন-চার বছর আগে আমিরের মাধ্যমে চক্রে যোগ দেয়। সে লুট করা স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মালামাল রাজধানীর বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিল।
