কুবি প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০২:৫৩ এএম

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

গত শনিবার ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একটি পক্ষ ফাঁকা গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র হত্যা মামলার আসামির নেতৃত্বে বহিরাগতরা এ ঘটনা ঘটায়। তাদের প্রতিহত করার কথা বলে অন্যপক্ষ হকিস্টিক, ক্রিকেট ব্যাট ও রামদা নিয়ে মহড়া দেয়। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং পরীক্ষা স্থগিত করেছে। এর আগে শুক্রবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি বিলুপ্ত করার খবর আসে।

প্রশাসনের সামনে দিয়ে সেদিন বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে আবার নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া যাদের কারণে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে হল ও পরীক্ষা বন্ধ করা তাদের এক ধরনের আশকারা দেওয়া বলে মনে করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ছাত্র না হয়ে অছাত্র যদি হয়ে থাকে, তাহলে তাদের প্রবেশ বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা নেব। ওদের শনাক্ত করার বিষয়ে আমি প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলব। পরবর্তীকালে যাতে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পারে আমরা সে ব্যবস্থা নেব।’

গত শনিবার বেলা ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকীর সামনে দিয়েই শতাধিক বহিরাগত নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে অস্ত্রের মহড়া দেয় ছাত্রলীগের একটি অংশ। ক্যাম্পাসে প্রবেশের পরই ফাঁকা গুলি ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় তারা। এ অংশের নেতৃত্বে ছিলেন খালেদ সাইফুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি বিপ্লব চন্দ্র দাস। ২০১৬ সালের ১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খালেদ সাইফুল্লাহ। এ ছাড়া বিপ্লবের সঙ্গে ছিলেন ২০১৭ সালে বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহীসহ আরও কয়েকজন। বহিরাগতদের মধ্যে ছিলেন ইকবাল হোসেন ওরফে টারজান ইকবাল, শাহজাহান, কোটবাড়ীর সালমানপুর ও বাতাইছড়ি (রেজা-ই-এলাহীর গ্রাম) এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা কবির, লিটন, আলাউদ্দিন, মনির, মোশাররফ, আকতার, নজির আহমেদ, সুমনসহ স্থানীয় কয়েকজন অটোরিকশাচালক। ইকবালের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগ আছে। শাহজাহান ডাকাতি মামলার আসামি।

বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে আসা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো বহিরাগত ছিল না। ককটেল বিস্ফোরণ ও ফাঁকা গুলির অভিযোগ মিথ্যা। আর বিপ্লব দাসকে খালেদ সাইফুল্লাহর খুনি বলা হলেও এখনো মামলা চলছে এবং এ মামলার অনেক আসামি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছে।’ খালেদ সাইফুল্লাহ হত্যা মামলার প্রধান আসামি বিপ্লব চন্দ্র দাসের মোবাইল ফোনে কল দিলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বঙ্গবন্ধু হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘তারা স্পষ্টতই গুলি ছুড়েছে। প্রশাসনের আশকারা না থাকলে তাদের সামনেই গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ করে তারা বেরিয়ে যেতে পারত না।’

বহিরাগতদের প্রবেশের কিছুক্ষণ আগে থেকেই ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে অবস্থান করছিলেন প্রক্টরসহ কয়েকজন শিক্ষক ও পুলিশ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ক্যাম্পাসে হামলার বিষয়ে প্রশাসন আগে থেকেই জানত এবং তাদের যোগসাজশেই বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসাইন মাসুম, যিনি বহিরাগতরা চলে যাওয়ার পর প্রক্টরের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়ান, তার অভিযোগ প্রক্টর বলছেন যে তারা আগে থেকেই ঘটনার আভাস পেয়েছেন। তাহলে তারা হলের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে পুলিশকে প্রধান ফটকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন কেন? তাদের সামনেই প্রধান ফটক খোলা হয়েছে, বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের এক নেতার দাবি, বহিরাগতরা প্রবেশের সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকলেও তাদের পদক্ষেপ নিতে দেয়নি প্রশাসন। আবার হামলা চালিয়ে তাদের সামনে দিয়েই নির্বিঘ্নে বেরিয়ে গেছে বহিরাগতরা।

বহিরাগতদের মহড়ার পরই বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে মহড়া দিয়েছে শাখা ছাত্রলীগের ‘বর্তমান’ কমিটির নেতাকর্মীরা। তাদের মধ্যে ছিল ইমাম হোসাইন মাসুম (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক), কাজল হোসাইন (সহ-সম্পাদক), জিলান আল সাজিদসহ (সভাপতি, বিজ্ঞান অনুষদ) আরও অনেকেই। তাদের হাতে রামদা, হকিস্টিকসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়। পুলিশ ও প্রক্টরের সামনেই এসব অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেন তারা।

‘বর্তমান’ কমিটির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বহিরাগতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তো এখানে কোনো ঘটনাই ঘটত না। প্রশাসনের বহিরাগতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার মানে হচ্ছে এখানে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা আছে এবং তারাই এখানে দায়ী।’

যদিও এমন আভাস পাওয়ার বিষয় অস্বীকার করেছেন প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রক্টরিয়াল বডি সেখানে যাবে এটাই স্বাভাবিক। প্রক্টরিয়াল বডি এটা ইফেশিয়েন্টলি হ্যান্ডেল করে শেষ করেছে কি না এটা হচ্ছে পয়েন্ট। প্রক্টরিয়াল বডি সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত হয়ে সবাইকে সাকসেসফুলি বের করতে পেরেছে।’ হত্যা মামলার আসামি প্রক্টরের সামনে দিয়ে চলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোন খুনের আসামি, আমি তো চিনি না।’ পরে খালেদ সাইফুল্লাহ হত্যার কথা বলা হলে তিনি বলেন, ‘এ মামলার কি রায় হয়েছে? আমি জানি না তো!’

বিঘ্নিত হচ্ছে শিক্ষার পরিবশ : ছাত্রলীগের দুপক্ষের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন। সেই সঙ্গে পূজার ছুটি শেষে ১০ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত পরীক্ষা বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শাহিন মিয়া নামে এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি কি প্রশাসনের নেই? বহিরাগত সন্ত্রাসীদের ভয়ে তারা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা অফ করে দেয় আবার হলও সিলগালা করে। মেরুদ-হীন প্রশাসন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের এমন নির্লিপ্ততায় স্পষ্টতই বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিমধ্যে হল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কতদিন নাগাদ খুলবে, তাও বলা যাচ্ছে না।’

শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. দুলাল চন্দ্র নন্দী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হল বন্ধ করার মতো বড় ঘটনায় অতীতে জরুরি অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল কিংবা সিন্ডিকেট সভা ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। কিন্তু এবার প্রশাসন শুধু ডিন, প্রক্টর ও প্রভোস্টদের নিয়েই নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত