গ্রিড বিপর্যয়ে চরম দুর্ভোগ

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৪:৫৩ এএম

পাঁচ বছরের বেশি সময় পর জাতীয় গ্রিডে আবার বড় ধরনের বিপর্যয় দেখল দেশ। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় গ্রিডের একটি সঞ্চালন লাইনে বিভ্রাট দেখা দেওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এতে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি কল-কারখানায় উৎপাদন ও অফিস-আদালতে কাজকর্ম বিঘি্নত হয়। হাসপাতালগুলোতে সেবা ব্যাহত হয়। জেনারেটর চালাতে জ্বালানি তেল কিনতে পেট্রলপাম্পগুলোতে ভিড় করে মানুষ।

বিপর্যয়ের শুরু : গতকাল দুপুর ২টার কিছু সময় পর এ বিপর্যয় দেখা দেয় বলে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

পিজিসিবির এক কর্মকর্তা একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, যমুনা সেতুর পূর্ব পাশের ন্যাশনাল গ্রিডে দুপুর ২টা ৫ মিনিটে বিপর্যয় হয়েছে। ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় একটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়নি। একটা পর্যায়ে সারা দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না।

পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াকুব ইলাহী চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা একেবারে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, ঘোড়াশালে গ্রিড বা বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো একটি লাইন ট্রিপ করেছে। সেই লাইনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অন্য লাইন ওভারলোড হয়ে সেটা ট্রিপ করেছে। এর ফলে পূর্বাঞ্চলের গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বল্পতা দেখা দেয়।’

দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমেই সারা দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয়ে থাকে।

ইয়াকুব ইলাহী চৌধুরী বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহের বড় এলাকা এ বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে, পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় আংশিক বিদ্যুৎ চলে যায় বলে জানান নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এক এলাকায় সমস্যা হলে সেটা অন্য এলাকাকেও আক্রান্ত করে।’

এক মাস আগেই জাতীয় গ্রিডের আরেকটি সঞ্চালন লাইনের বিভ্রাটে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল বিভাগসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা।

বারবার কেন সমস্যা হচ্ছে এ প্রশ্ন করা হলে ইয়াকুব ইলাহী চৌধুরী একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কারিগরি ত্রুটির কারণেই এমনটি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। ওভারলোডের কারণে সমস্যা হয়নি। তবে আরও কোনো কারণ আছে কি না, তা বুঝতে সময় প্রয়োজন।’

জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, জাতীয় গ্রিডে কী কারণে এ বিপর্যয়, তা জানার জন্য দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বিদ্যুৎ ছিল না গতকাল দুপুর ২টা থেকে। চট্টগ্রামও আড়াইটার পর থেকে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা যেটা জানতে পেরেছি ন্যাশনাল গ্রিডের ইস্টার্ন জোনে বিপর্যয় হয়েছে। তবে সমস্যা ঠিক কোথায়, সেটা আমরা এখনো জানতে পারিনি।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, ‘সমস্যাটা আমাদের এখানে না। তবে গ্রিড ফেইল করেছে।’

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। কোনো কারণে কোনো কেন্দ্র বা সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো সিস্টেমে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে কিছু এলাকা বিদ্যুৎহীন রেখে অথবা অন্য কোনো গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ এনে ‘লোড’ সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা করা না গেলে, অর্থাৎ লোড সমন্বয় না হলে অন্য কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। এভাবে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেনারেটর বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর নতুন করে কোনো কেন্দ্র বন্ধ হলে সরবরাহে ঘাটতি আরও বাড়ে এবং একইভাবে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করতেও কিছুটা বিদ্যুৎ লাগে।

আট ঘণ্টা পর স্বাভাবিক হতে শুরু করে : জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের প্রায় আট ঘণ্টা পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া শুরু করে। গতকাল রাতে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুপুর আড়াইটায় আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন চালুর মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা হয়। রাত ৯টায় সিস্টেম জেনারেশন ৮ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট এবং পরে জেনারেশন বাড়িয়ে সতর্কতার সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার কাজ চলে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জাতীয় গ্রিডের পূর্বাঞ্চলের বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ, মেঘনাঘাট, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ) চালু করে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়। রাত ৯টা ৪০ মিনিটে ঢাকায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১ হাজার ৭৫০ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়। অনাকাক্সিক্ষত এ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল দুপুর ২টা ৪ মিনিটে জাতীয় গ্রিডের পূর্বাঞ্চলে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ) অনাকাক্সিক্ষতভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে। অতি দ্রুততর সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন। এ সময় দেশের উত্তর অঞ্চল (রাজশাহী, রংপুর) ও দক্ষিণ অঞ্চলের (খুলনা, বরিশাল) বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।

এদিকে গতকাল রাত ৯টার দিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেজে লিখেছেন, ঢাকার মিরপুর, মগবাজার, মাদারটেক, রামপুরা, গুলশান, উলন, বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, আফতাবনগর, বনশ্রী, ধানমন্ডি (আংশিক), আদাবর, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, মিন্টো রোড, মতিঝিল, শ্যামপুর, পাগলা, পোস্তগোলাসহ বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল হয়েছে।

এর দুই ঘণ্টা আগে এক ফেইসবুক পোস্টে ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জের আংশিক এলাকায় সরবরাহ চালু হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

ভোগান্তি, পেট্রলপাম্পে ভিড় : বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে রাজধানীর সড়কগুলোতে বাতি জ¦লেনি। ফলে রিকশাচালক ও পথচারীদের অন্ধকারে যাতায়াত করতে হয়। দোকানপাট, হোটেলে মোমবাতি জ¦ালিয়ে বেচাকেনা করতে দেখা যায়। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে হাসপাতালে রোগীদের সেবা বিঘ্নিত হয়। ইন্টারনেট, ব্যাংকের এটিএম বুথও বন্ধ থাকে। বাসাবাড়িতে পানি সংকটে পড়ে মানুষ। মোমবাতি কেনার জন্য দোকানে ছোটে মানুষ।

লালবাগ এলাকা থেকে মাসুম নামে এক ব্যক্তি দেশ রূপান্তর কার্যালয়ে ফোন করে জানতে চান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে।

বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে বিকেল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পেট্রলপাম্পগুলোতে ডিজেল কিনতে মানুষ ভিড় করে।

আমাদের উত্তরা (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, ওই এলাকার অধিকাংশ পেট্রলপাম্পে জেনারেটরের তেল কিনতে লম্বা ভিড় করেন অফিস-আদালতসহ বাসাবাড়ির লোকজন। আবদুল্লাহপুর, আজমপুর, এক নম্বর সেক্টরের পেট্রলপাম্পগুলোতে ভিড় দেখা যায়।

উত্তরা আজমপুর পাম্পে তেল কিনতে আসা বেসরকারি কোম্পানির কর্মচারী সাব্বিরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ না আসায় অফিসের বস জেনারেটরের তেল কিনতে পাঠিয়েছেন। এখানে এসে দেখি তেল কিনতে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।’

অন্যদিকে আবদুল্লাহপুর উত্তরা পাম্পে ১১ নম্বর সেক্টর, ১২ নম্বর রোডের বহুতল ভবনের সুপারভাইজার মানিক মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাম্পে তেল নিতে এসেছি। যে পরিমাণ তেল নেওয়া দরকার, ওই পরিমাণ তেল পাম্প থেকে দিতে চাচ্ছে না। অনেকেই পেট্রলপাম্পের কর্মচারীদের সঙ্গে বাগ্বান্ডিত-ায় জড়িয়ে পড়েছে।’

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, রাত ৮টার দিকে নগরীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হতে থাকে। তবে প্রায় ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নানা ভোগান্তিতে পড়ে লোকজন; বিশেষ করে বাসাবাড়ি, কল-কারখানা, হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকায় চরম বেকায়দায় পড়ে মানুষ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দুই বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে ১৩ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা জোহরা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে জানান, দুপুর ২টা থেকে হাসপাতালে বিদ্যুৎ নেই। তবে বাতি জ¦লছে। তার ছেলেকে নেবুলাইজড করতে পারেননি। নার্সরা বলেছেন, বিদ্যুৎ নেই, তাই করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ এলেই নেবুলাইজড করানো হবে।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেনারেটরের মাধ্যমে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি। কাজ চালিয়ে নিচ্ছি। পর্যাপ্ত পরিমাণে তেল কিনে মজুদ রেখেছি। সিসিইউ, আইসিইউ, অস্ত্রোপচারকক্ষে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অন্যান্য ওয়ার্ডেও বাতি জ¦লছে।’

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, দুপুর ২টার পর থেকে হঠাৎ করে পুরো জেলা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। পরে জানা যায়, বিভাগের চার জেলার কোথাও বিদ্যুৎ নেই। এতে বাসাবাড়িতে পানির সংকটসহ নানা জনদুর্ভোগ দেখা দেয়। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ আসতে শুরু করে।

সর্বশেষ গত ৬ সেপ্টেম্বর সঞ্চালন লাইনে বিভ্রাট দেখা দিলে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল বিভাগসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা ৪০ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকে। ওই ঘটনায় পিজিসিবির প্রধান প্রকৌশলী (সিস্টেম অপারেশন) বিএম মিজানুল হাসানকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল, তা আর জানানো হয়নি।

কালবৈশাখী ঝড়ে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালীপুরে একটি বিদ্যুতের টাওয়ার ভেঙে পড়ে ২৩০ কিলো ভোল্টের সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে ২০১৭ সালের ২ মে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ জনপদের অন্তত ৩২ জেলার মানুষকে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়।

তার আগে ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা সঞ্চালন কেন্দ্রে বিপর্যয় দেখা দিলে ভারতের সঙ্গে সঞ্চালন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ভারতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রক্রিয়া। একই সময় দেশের উৎপাদনে থাকা সব বিদ্যুৎকেন্দ্র একযোগে বন্ধ হয়ে গেলে, ধস নামে উৎপাদনে। ফলে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত