রিকশাচিত্রের আদি স্ট্রোকের সঙ্গে বরেণ্য শিল্পীদের নিজ নিজ স্টাইল

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০১:৫১ পিএম

যে কামরুল হাসানের ছবিতে পাশ্চাত্য কিউবিজমের সেই জ্যামিতিক ফর্ম, বিষয়কে ‘এনালিটিক’ ও ‘সিনথেটিক’ দিক থেকে দেখার প্রবণতা ছিল, গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে গিয়ে যিনি পড়াশোনা করলেন পাশ্চাত্য ধারার শিল্প রীতি, সেই কামরুল হাসানকে ‘পটুয়া’ কেন বলা হয়? কেন তাঁর কাজে বাংলার ‘ফোক’ রীতি এলো? ব্রতচারী আন্দোলনে যাবার পর তিনি দেখতে পেলেন, এখানকার চিত্রকলা, নৃত্য, সঙ্গীত সবই যেন দেশের পলিমাটি দিয়ে গড়া। দেখলেন, নদী, জল, গো মহিষ, কন্যা, মাতা, রাখাল ছেলে সবাই যেন তার সঙ্গে কথা বলে; গাঁয়ের বধূরা তাকে দেখলে মুখ ঢেকে নেয় ঘোমটায়, শাপলা পুকুর থেকে জল তোলে কেউ, নানা বয়সের কন্যারা একে অপরের সাথে কথা বলতে গিয়ে কলকলিয়ে ওঠে যেন নদীর মতন। এরপরই তৈরি হলো, ‘তিন কন্যা’, ‘জলকে চল’, ‘নাইওর’ ইত্যাদি। জয়নুল আবেদীনও তাঁর কাজে টেপা পুতুলের মতন মুখ, বাঁশের বেড়া, প্রাথমিক রঙে আঁকা শাড়ি, আলদা, চুড়ির ব্যবহার করেছেন। নিজের কাজের ধারায় অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছেন বাংলার আদি উৎসগুলোকে। শিল্পীদের নিজস্ব আর্ট স্টাইলের সঙ্গে পুরাতন বা ঐতিহ্যবাহী ফর্মের ব্যবহার তাই নতুন নয়।

বাংলাদেশে আলিঁয়স ফ্রঁসেজে (ঢাকা) ১৯৯৯ সনে রিকশাচিত্রের ওপর সবচে বড় প্রদর্শনী হয়েছিল। ৫০০ জন রিকশা পেইন্টার এবং ৮৩ জন বেবিট্যাক্সি পেইন্টারের চিত্রকর্ম ছিল সেখানে। রিকশা শিল্পের কদর ছিল বিদেশেও। ১৯৮৮ সালে লন্ডনে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে (তৎকালীন মিউজিয়াম অব ম্যানকাইন্ড) একটি রিকশাচিত্রের প্রদর্শনী হয়। শিরিন আকবরের কিউরেটিংয়ে হওয়া এই প্রদর্শনীর  নাম দেয়া হয়েছিল ‘ট্রাফিক আর্ট: রিকশা পেইন্টিং ফ্রম বাংলাদেশ’। নিজস্ব শৈলী, স্বকীয়তা এবং নিজস্ব চিন্তার সঙ্গে রিকশা চিত্রের মিশেল দেখা যায় এই প্রদর্শনীতে।  জাপানের তাকামাতসু শহরেও ২০১৩ সালে একটি আর্ট ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের রিকশাচিত্র বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে। নেপালেও হয়েছে বাংলাদেশের রিকশাচিত্রের প্রদর্শনী।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় রিকশা আসে বলে ধারণা করা হয়। মূলত সে সময়েই রিকশা চিত্রের চল শুরু। মানুষ এর জনপ্রিয়তা দেখে অন্যান্য নানান পেশা থেকে চলে আসেন এই রিকশা আঁকার কাজে।  সেই যে থেকে শুরু হওয়া, এরপর নানান সময়ে নানান ধারা দেখা যায় এই ট্রাফিক আর্টে। একটা রিকশা বাজারে আসবার আগে ৬ জন মিস্ত্রির হাত হয়ে আসে (বডি মিস্ত্রি, পেইন্টার, বাতা কারিগর, হুড মিস্ত্রি, রঙ মিস্ত্রি, ফিটিং মিস্ত্রি)।  মানুষ তখন রিকশায় সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় মানুষ, সমাজ, মিথ, সংস্কৃতি নিয়ে আঁকতো। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রের শীর্ষস্থানীয় চরিত্র আঁকার চল শুরু হলো। কোনো সিনেমা ব্যবসা সফল হলেই সিনেমার নায়ক, নায়িকা এমনকি ভিলেন নিয়েও আঁকা হতো ছবি। ১৯৭৭ সালে ইবনে মিজান পরিচালিত ‘নিশান’ সিনেমাটির কত ছবি যে রিকশায় আঁকা হয়েছিল, তার গুণতি নেই। চলতি সিনেমার ব্যাপারে খোঁজ রাখার বড় এক উপায়ই হয়ে উঠলো সিনেমা। নায়ক নায়িকার অবয়ব হুবহু না মিললেও, অদ্ভুত পার্সপেক্টিভের ব্যবহার, ইচ্ছে মতন বানান এমনকি ব্যবহৃত ডায়ালগের ভুলভাল বানান মিলঝুলে রিকশা আর্ট যে আমাদের শিল্প চর্চার নূতন এক ধারার শুরু করেছিল, তা হয়তো আমরা টের পেয়েছি বেশ পরেই। তবে সে সময়ের মানুষ সিনেমা ছাড়াও, চিত্রকর্ম এবং শিল্প নিয়েও কতটা তৎপর ছিল, তা বোঝা যায় ১৯৫৯ সালে আঁকা জয়নুল আবেদিন এর ‘সংগ্রাম’ ছবিটিকে রিকশা চিত্রে নিয়ে আসার ঘটনায়। নানান ভঙ্গিতে এই ‘কাদায় আটকে যাওয়া গরুর গাড়ি’ তথা ‘সংগ্রাম’ আঁকা হতে থাকে রিকশার পেছনের টিনে। সিনেমা, ঘটনাবলি, সাম্প্রতিক চিত্র মিলে একেকটা  রিকশা হয়ে উঠেছিল ‘মুভিং গ্যালারি’।  সত্তর দশকের মাঝামাঝি রিকশাচিত্রে নতুন এক মাত্রা যুক্ত হয়। মানুষের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রাণী, যেমন বাঘ, সিংহ আঁকা শুরু হয় তখন। যেমন, বাঘ ট্রাফিক সিগন্যাল পরিচালনা করছে, সিংহ হয়েছে বৈঠকের মূল এবং চারপাশে কয়েকটি  শিয়াল বসা। এসব কাজে নানান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও মেটাফোরিকভাবে উঠে এসেছিল। তবে, ধর্মীয় মিথের চর্চা, বিভিন্ন গল্প-উপাখ্যানের চরিত্র যেমন, দুলদুল, বোরাক, আলাদ্বীনের চরিত্র গুলো, সুলতান সোলেমান, রাজপ্রাসাদ, মসজিদ রিকশাচিত্রে প্রাধান্য পেয়েছিল। এখনো তা দেখা যায়।

image

ঢাকা যখন নূতন করে গড়ে উঠছিল, রিকশাশিল্পে বেড়ে যায় কল্পনার প্রভাব। শিল্পীরা ঢাকাকে নিজেদের মতন কল্পনা করে আঁকতে থাকেন। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের এক্সিবিশনের জন্য শিশির ভট্টাচার্য এবং রিকশা শিল্পী ডি.সি. দাস মিলিত ভাবে এঁকেছিলেন কাল্পনিক ঢাকা শহর। তবে,  নানান বাধা, তৎকালীন রাজনীতিকে স্যাটায়ার হিসেবে আঁকা, প্রতিবাদে ‘এন্টি আর্ট’ এর বিষয়টির দিকে তাকালে হুট করে রিকশাচিত্রীদের কিছুটা ‘দাদাবাদী’ মনে হতে পারে। রিকশাচিত্রে ফর্মের আগে ‘ডেকোরেশন’ বেশি চোখে পড়ে। এখানে রঙের স্বকীয় ব্যবহার, কল্পনা শক্তি মূল বিষয়। তবে সময়ের পরিবর্তনে, রিকশাশিল্পে রূপান্তর এসেছে। লিভিং আর্ট কিংবা পপ আর্ট, যে নামেই ডাকা হোক; নব্য মডার্ন আর্টের এই ধারাটিকে শুধুমাত্র রিকশা কিংবা বাহনে আর আটকে রেখে চলছিল না। তাই তা ছড়ানো শুরু করলো নানান ফরম্যাটে। পোস্টার, ব্যানার থেকে শুরু করে বর্তমানে রিকশা আর্ট ঘর সাজানো কিংবা ফ্যাশন জগতের গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান হিসেবে গোনা হচ্ছে।

গত বছরের ডিসেম্বরের ৭ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশ লোক শিল্প ফাউন্ডেশন ও ঢাবির চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের উদ্যোগে রিকশাচিত্রের ওপর একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। এতে চারুকলার প্রায় ৩৫ জন শিক্ষার্থী, ৫ জন রিকশাশিল্পী, শিক্ষকরা অংশ নেন। সেখানে রিকশাশিল্পীরা এই শিল্পের করণকৌশল দেখান। টিন বা স্টেইনলেস বেস ছাড়াও কর্মশালায় নানান মাধ্যমের ওপর করা হয়েছিল রিকশা পেইন্ট। পরে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ৩২ শিক্ষার্থী, ২০ জন রিকশাশিল্পী ও চারুকলার শিক্ষকদের কাজ নিয়ে চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ‘বাংলাদেশের রিকশাচিত্র: উৎস অনুপ্রেরণার চর্চা’ শিরোনামে এক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে রফিকুল ইসলাম, এস.এম. শামসু, সৈয়দ আহমদ প্রমুখ রিকশাশিল্পী এবং নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য, ঢালী আল মামুন, নাজলী লায়লা মনসুর হাশেম খানের মতো দেশ বরেণ্য শিল্পীর কাজ প্রদর্শিত হয়।

প্রদর্শনীতে বরেণ্য শিল্পীদের কাজে রিকশাচিত্রের আদি আদি ধারার স্ট্রোকের সঙ্গে তাদের নিজ নিজ স্টাইলের উপস্থিতি দেখা গেছে। শিল্পী নিসার হোসেনের কাজ দুটো ৮৯-৯১ এর মধ্যে করা। মানুষকে ‘মাংসাশী’ রূপে দেখানোর একটা সিরিজ করেছিলেন তিনি। রিকশা চিত্রের রঙ, লাইন এবং কিছুটা ফর্ম নিলেও ছবি দুটোর দিকে তাকালে শিল্পীর নিজস্বতাই ফুটে ওঠে। যেন, রিকশা আর্টের ফর্মগুলো মিলে গেছে আবার কোথাও ফুটে উঠছে স্পষ্ট ভাবে। ছবিতে কয়েকটি মনুমেন্টাল ভাগ, শেয়ালের উপস্থিতি ‘গাজীর পটের’ এর কথাও মনে করায়।

শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য এবং রিকশাশিল্পী ডি. ডস. দাস দুজন মিলে একটি ক্যানভাসে ছবি এঁকেছেন। কাজটিতে শিশির ভট্টাচার্যের চিরাচরিত এক্সপ্রেসিভ ক্যারেক্টারের উপস্থিতি, আর ডি. ডস. দাসের রিকশাশিল্পের অরিজিনাল স্টাইল মিলেমিশে রয়েছে। শিল্পী শহীদ কাজী সাম্প্রতিক বিষাদপূর্ণ ঘটনাবলি এবং একজন ঘটনা উদ্ভূত এক নারীকে এঁকেছেন এমনভাবে, যেন রিকশা থেকে মুখের অর্ধাংশ দেখা যায়। তার কাজে সাম্প্রতিক ছাপ, সমস্যার চিত্র এবং কোলাজের বিষয়াদি আগেই ছিল, সেই ধারায় তিনি যোগ করেছেন রিকশা আর্টের ‘ময়ূর’। নিজস্ব স্টাইলের সাথে রিকশা চিত্রের আরও কিছু সুন্দর ব্লেন্ডিং দেখা যায় হাশেম খান, ঢালী আল মামুন, নাজলী লায়লা প্রমুখের কাজে। শিক্ষার্থীদের কাজগুলোতে পুরাতন ধারার সেই রিকশা-স্টাইল যেমন আছে, সেগুলোতে ‘ক্রসওভার’ হিসেবে উঠে এসেছে নিজেদের এবং চলতি সমাজের নানান ঘটনা। 

রিকশাচিত্রের এই মুভিং আর্ট গ্যালারিটি হয়তো আগের মতন কেবল বাইরে নামলেই যথাতথা দেখা যায় না, সেসবে চলে এসেছে ডিজিটাল প্রিন্টের ছোঁয়া। কিন্তু নগরায়নের সাথে সাথে নগরচিত্রের এই ফর্মটি টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন। আমরা কখনো আমাদের আদিকে পুরোপুরি ভুলে দাঁড়াতে পারি না, বরং তাকে সঙ্গে নিয়েই চলা উত্তম। 

লেখক: ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী, অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত