পক্ষে রওশন বিপক্ষে কাদের

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০৪:৪৯ এএম

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) নির্বাচন প্রশ্নে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসাধীন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া ভিডিও বার্তায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তার দল অবশ্যই নির্বাচন করবে এবং ইভিএমেই করবে। অন্যদিকে একই দিন রংপুরে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও রাজধানীতে দলের মহাসচিব অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক চুন্নু ইভিএমের বিপক্ষে দলের শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তারা দুজনই বলেছেন, ইভিএমের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে এবং তারা ইভিএমে নির্বাচন চান না।

এর ফলে গত দেড় মাস ধরে রওশন ও কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপা নেতাদের মধ্যে চলে আসা দ্বন্দ্বে এবার নতুন করে যুক্ত হলো ইভিএম ইস্যু। এ ছাড়া আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নেও দুপক্ষের মধ্যে অস্পষ্ট কিছু মতবিরোধও দৃশ্যমান হয়েছে গতকাল। ভিডিও বার্তায় রওশন এরশাদ কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই নির্বাচনে জাপার অংশগ্রহণের ব্যাপারে মত দেন। পক্ষান্তরে জিএম কাদের গতকালও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে দলের পক্ষ থেকে কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে হবে বলেও জানিয়েছেন। আর মহাসচিব চুন্নু নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নির্বাচনের ব্যাপারে দলের সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি তুলে ধরেছেন।

ভিডিও বার্তা নিয়ে এলেন রওশন এরশাদ : দেড় মাস আগে ব্যাংকক থেকে দলের দশম জাতীয় কাউন্সিলের ডাক দিয়ে অনেক দিন পর আলোচনায় এসেছিলেন রওশন এরশাদ। এরপর তিন দফায় চিঠির মাধ্যমে নানা ধরনের সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়ে সরব ছিলেন তিনি। গতকালই প্রথম ভিডিও বার্তা নিয়ে দেখা দিলেন ব্যাংককে চিকিৎসাধীন রওশন। সকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনের একটি হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে রওশন এরশাদের ধারণ করা ভিডিও বার্তাটি প্রচার করা হয়। রওশনের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।

ভিডিও বার্তায় রওশন বলেন, ‘সারা বিশ্বে ইভিএমে নির্বাচন চলছে। জাতীয় পার্টি কখনো নির্বাচন বর্জন করেনি। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে বিশ্বাস করে এবং অংশ নেয়। আমরা অবশ্যই নির্বাচন করব। ইভিএমেই নির্বাচন করব।’

ভিডিও বার্তায় রওশন এরশাদ আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে ইভিএমে (নির্বাচন) হবে, এটা তো নতুন কথা নয়, যখন আমরা ফাইভ-জি ব্যবহার করছি। তাহলে এতে মানা কোথায়। যারা নির্বাচনে জিতে তারা বলে নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে, যারা হেরে যায় তখন বলে ফেয়ার হয়নি। অবশ্যই ইভিএমের মাধ্যমে নির্বাচন করব।’

ভিডিওতে রওশন এরশাদ জানান, তার স্বাস্থ্য এখন বেশ ভালো। এখন অনেকটা সুস্থ। পায়ের গিঁটে সমস্যা আছে। সেটার জন্য ব্যাংককে ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন। হার্ট, কিডনি সব ভালো আছে। ক্যানসার নেই। চলতি মাসেই দেশে ফিরবেন।

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এইচএম এরশাদের মৃত্যুর পর দল অনেকটা দুর্বল এবং এলোমেলো হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘দলকে শক্তভাবে দাঁড় করাতে হবে, বহিষ্কৃত এবং নিষ্ক্রিয়দের দলে ফেরাতে হবে, যাতে আগামী নির্বাচনটা ভালোভাবে করতে পারি।’

রওশন এরশাদ বলেন, ‘আমি জানি, নির্বাচন দেওয়া হবে, ভালো নির্বাচন হবে এবং দেশটা এগিয়ে যাওয়ার জন্য তারা কাজ করবে যারা জিতে আসবে। দেশবাসী নিশ্চয়ই ভালো থাকবে নির্বাচনে। ইনশাআল্লাহ ভালো ফলাফলই হবে।’

দশম জাতীয় কাউন্সিল ডাকার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কাউন্সিল ডেকেছি এর অনেক কারণ আছে। বিশেষ করে গত কাউন্সিলে আমাদের গঠনতন্ত্রকে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। যেখানে যেখানে যার যার ক্ষমতা ছিল, সে ক্ষমতা খর্ব করে দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় সংশোধন করে নতুন করে গঠনতন্ত্র আনা হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি। পার্টিকে শক্তিশালী করতে হবে। পার্টি অনেক বেশি এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সংঘবদ্ধ করতে হবে। এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে আগামী নির্বাচনে আমরা ভালো ফলাফল করতে পারি।’

দলের বাইরে থাকা নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলেন, ‘আমাদের বেশিরভাগেরই বয়স হয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই দলে আনতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা, যারা রিটায়ার্ড করেছেন, তাদেরও আনতে হবে। যারা পার্টি থেকে বহিষ্কার হয়ে গেছেন, পার্টি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন, তারা এখন সক্রিয় হতে চাচ্ছেন। আবার জাতীয় পার্টি করার জন্য তারা উদগ্রীব হয়েছেন।’

ভিডিওতে রংপুরবাসীর উদ্দেশে রওশন এরশাদ বলেন, ‘রংপুরবাসীরা দুর্দিনে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং তারা বিশেষ করে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য, সহায়তা করেছে, তাদের কাছে আমি অনেক কৃতজ্ঞ। তারা ভালো থাকুক, এ দোয়া করি।’

সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মসীহ্ ছাড়াও রওশনের ডাকা ১০ জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. ইকবাল হোসেন রাজুসহ রওশনপন্থি জাপা নেতাদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন খান, এসএমএম আলম, জিয়াউল হক মৃধা, এমএ গোফরান, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, নুরুল ইসলাম, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, ইকবাল হোসেন ও কাজী মামুনুর রশীদ উপস্থিত ছিলেন।

জাপা নেতারা জানান, সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতাদের মধ্যে কেউই দীর্ঘদিন ধরে দলে নেই। তাদের মধ্যে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব গোলাম মসীহর পার্টিতে প্রাথমিক সদস্যপদও নেই। বাকিরা প্রত্যেকেই দল থেকে বহিষ্কার বা অব্যাহতি পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ দলীয় পদ থেকে বাদ পড়েছেন।

ইভিএমে নির্বাচন চায় না জাপা : গতকাল নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জাপা নেতারা ইভিএমের বিপক্ষে দলের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সিইসির সঙ্গে সাক্ষাতের পর মহাসচিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনগণের ধারণা হলো ইভিএম ফল উল্টে দেওয়ার মতো একটা মেশিন। ফলে যারা মেশিন চালায় তাদের দোষ। ইভিএমে নির্বাচনের ওপর সবসময় আমাদের আপত্তি, আমরা ইভিএমে নির্বাচন চাই না। তারপরও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে আমরা নির্বাচনে গেলাম, পরে আমরা কী করব দল সেই সিদ্ধান্ত নেবে।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মহাসচিব বলেন, ‘জাতীয় পার্টির মধ্যে কোনো ভাঙন নেই। দলের দুই-একজন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, আমরা তাদের অব্যাহতি দিয়েছি। আমাদের কোনো কাউন্সিল নেই, কে কোথা থেকে কাউন্সিল ডাকল এতে কিছু আসে যায় না। জাতীয় পার্টি কোনো দালালির রাজনীতি করে না।’

মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘আমরা সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। গাইবান্ধার একজন সংসদ সদস্য সাবেক ডেপুটি স্পিকার মারা যাওয়াতে তার আসনটি শূন্য হয়। সেখানে নির্বাচন হচ্ছে, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছে, জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকেও আমরা সেখানে প্রার্থী দিয়েছি। যদিও আমরা ইভিএমে নির্বাচনের পক্ষে না। সেই নির্বাচনটি ইভিএমে হবে। জাতীয় পার্টির একটা কালচার আছে যে, আমরা কখনো নির্বাচন বর্জন করি না। কারণ নির্বাচন বর্জন করাটা মনে করি গণতন্ত্রকে ব্যাহত করবে। আমরা প্রতিবাদ হিসেবেও পার্লামেন্টের উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি।’

এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘সেই নির্বাচনের বিষয়ে আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বলেছি, গাইবান্ধার উপনির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ করছি দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে। যদিও আমরা নীতিগতভাবে ইভিএমে নির্বাচনের বিরুদ্ধে। তারপরও আমরা বলছি, যদি এ নির্বাচনটা সুষ্ঠু করতে পারেন, মানুষের হয়তো কিছুটা আস্থা আসতে পারে। নির্বাচনটা যদি বিশ্বাসযোগ্য হয় এবং বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের যাতে এ ধারণা জন্মে যে, নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন, সেইগুলো আমরা তাদের বলেছি।’

জাপা মহাসচিব বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে এখন জেলা পরিষদের নির্বাচন হচ্ছে। গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে গাইবান্ধা থেকে আমাদের প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ বছরও তাকে প্রার্থী করা হয়েছে। আমরা দেখলাম আমাদের হুইপ সেই গাইবান্ধা গিয়ে তাদের পক্ষে নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচন করছেন। আমাদের কাছে প্রমাণ আছে। আওয়ামী লীগের লোকজন আমাদের প্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুর করেছে, অপমান-অপদস্থ করেছে, সঙ্গে যারা ছিল তাদেরও আহত করেছে। সেটার মামলা দিতে গিয়েছিল কিন্তু থানায় শুধু জিডি নিয়েছে, মামলা নেয়নি। এগুলো নিরসন করার জন্য এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনে সব কেন্দ্রে যাতে সিসিটিভির ব্যবস্থা করা হয় এসব বিষয় লিখিতভাবে আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেও ফেয়ার নির্বাচন হয় না। আমরা বলতে চাই, বর্তমান অবস্থায় নির্বাচন ফেয়ার করা সম্ভব নয়, একমাত্র যদি নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন না করা হয়। আমরা যেহেতু নির্বাচনের মুখে তাই প্রার্থী দিয়েছি। আমরা দেখতে চাই ইভিএম কতটুকু ফেয়ার করতে পারেন। আমরা দেখতে চাই, “ম্যান বিহাইন্ড দ্য গান” থাকে কি না।’

রওশন এরশাদের ডাকা পার্টির জাতীয় সম্মেলনের ব্যাপারে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে চুন্নু বলেন, ‘আমি জাতীয় পার্টির মহাসচিব, আমার জানামতে কোনো কাউন্সিল নেই। কে কোন কাউন্সিল করল, এটা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্যও নেই, সম্পর্কও নেই। আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যান বা কো-চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে একটি লোক কোথাও যায়নি। আমাদের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী এখনো কেউ দল ছেড়ে যায়নি। কারণ জাতীয় পার্টি এখন কারও দালালির রাজনীতি করে না। জাতীয় পার্টি এখন নিজস্ব রাজনীতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।’

মহাসচিব বলেন, ‘দলের দুই-একজন বিশৃঙ্খলা করেছিল। সে জন্য তাদের আমরা অব্যাহতি দিয়েছি। সম্প্রতি আওয়ামী লীগও তাদের দলের একজন সংসদ সদস্যকে অব্যাহতি দিয়েছে। তারাও কিন্তু দলের বিশৃঙ্খলার জন্য তাকে অব্যাহতি দিয়েছে। দলের সাংগঠনিক নিয়ম মেনেই আমরা তাদের অব্যাহতি দিয়েছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত