তাদের দেশে নেই উপমহাদেশের মতো ক্রিকেট উন্মাদনা। পরিণত বয়সের আগে তাই ক্রিকেট শব্দের সঙ্গেই পরিচিত থাকে না তারা। ক্রিকেট সরঞ্জাম চেনা তো অনেক দূরের বিষয়। তবুও দেশটির ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহী। ক্রিকেট জগতের বাইরে থাকা মেয়েদেরও পরিচয় করিয়ে দিয়েছে তারা এই খেলাটির সঙ্গে। সেই মেয়েরাই এবার গড়েছে ইতিহাস। নারী এশিয়া কাপের স্বাগতিক ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের চোখে জল ঝরিয়ে সেমিফাইনালে নাম লিখিয়েছে থাইল্যান্ড।
সিলেটের আকাশে শরতের শেষবেলাতেও নিয়ম করে হচ্ছে বৃষ্টি। এতে লিগ পর্বে টুর্নামেন্টে নিজেদের শেষ ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে কোনো বলই গড়াতে পারেনি মাঠে। ম্যাচ পরিত্যাক্ত হওয়াতে দুই দলই পায় সমান একটি করে পয়েন্ট। ৫ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার পাঁচে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করতে হয়েছে টাইগ্রেসদের। প্রকৃতির কান্নায় চোখের জল ঝড়েছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলেরও।
চোখের জল অবশ্য ঝড়ছে সোমবার থেকেই। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে মাত্র ৭ ওভারে ৪১ রানের লক্ষ্য পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা হেরেছিল ৩ রানে। আউটের পর অধিনায়ক জ্যোতির সানস্ক্রিন মাখা গাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ধরা পড়েছিল ক্যামেরায়। জাহানারা আলমের কাজল আঁকা চোখ বেয়েও ঝরছিল জল। হৃদয় ভাঙলে অশ্রু তো গড়াবেই। তাদেরকে চোখের জলে ভাসিয়ে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবার এশিয়া কাপের সেরা চার নিশ্চিত করেছে নাত্থাকান চান্থামের নেতৃত্বাধীন থাইল্যান্ডের মেয়েরা।
থাইল্যান্ডের মেয়েদের এমন উত্থানের পেছনে অবশ্য রয়েছে অনেক পরিশ্রম। রয়েছে দেশটির ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা। স্কুল পর্যায় থেকেই সেখানে ক্রিকেটের নিয়ম শেখানো থেকে কাজ শুরু থাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন।
থাইল্যান্ড নারী দলটির প্রধান কোচ ভারতীয় হার্শাল পাঠক সেসব জানিয়ে বললেন, ‘মেয়েদের দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড় চুক্তি ভুক্ত। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়রাও চুক্তিভিত্তিতে খেলে। ওখানে একটা স্কুল সিস্টেম চালু আছে। স্কুলে স্কুলে গিয়ে বোর্ড থেকে ক্রিকেট শেখানো হয়।’
উপমহাদেশের মতো ক্রিকেট উন্মাদনা সেখানে নেই জানিয়ে পাঠক বলেন, ‘উপমহাদেশের দেশগুলোতে ক্রিকেটের উন্মাদনার মাত্রা চরম। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা এসব দেশে জন্মের পর থেকেই পরিচিত থাকে ক্রিকেটের সঙ্গে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কিংবা খেলা দেখতে দেখতে শিখে যায় খেলাটির কৌশলও। থাইল্যান্ড এসব ক্রিকেট জাতির মতো নয় যে, ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট দেখে বড় হবে। ওদের আসলে প্রথমে খেলাটা বোঝাতে হয়, কীভাবে ব্যাট ধরতে হয়, বল করতে হয়। স্বেচ্ছাসেবকরা তৃণমূলে গিয়ে ক্রিকেট শেখায়। বিশ্বাস করুন এটা সহজ না। প্রথমে খেলার নিয়ম শিখিয়ে পরে তাদের খেলতে নামানো এটা সহজ কাজ না।’
এই টুর্নামেন্টেই খেলতে আসা সংযুক্ত আরব আমিরাত দলের সবাই ভারত ও শ্রীলংকান বংশোদ্ভূত। মালয়েশিয়া দলেও আছে তেমন। থাইল্যান্ড সেদিক থেকে একদম আলাদা, ‘থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে এখানে সবাই এথনিক খেলোয়াড়। সবাই থাইল্যান্ডের শেকড়ের মানুষ। এর মানে হচ্ছে ক্রিকেটটা বিস্তার লাভ করছে।’
নারীদের এশিয়া কাপে ইতিহাস গড়ে ফেলা থাইল্যান্ডে এখনো ছেলেদের ক্রিকেট দল গড়ে উঠেনি। এ বিষয়ে হার্শাল বলেন, ‘এই মুহূর্তে ছেলেদের দল নেই। তবে পাঁচ বছরের প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়েছে। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে কাজ করা হচ্ছে। আগামীতে হয়ত দাঁড়াবে। সেখানকার স্থানীয়দের দিয়ে সেই চেষ্টা শুরু হয়েছে।’
আপাতত একটি মাঠ ও ছোট এক ইনডোর দিয়ে চলছে থাইল্যান্ডের ক্রিকেট কার্যক্রম। স্কুলের মেয়েদের নিয়ম শিখিয়ে ক্রিকেটে নিয়ে আসছেন সেখানকার কর্তা ব্যক্তিরা। এই অবস্থায় এশিয়া কাপের মতো বড় আসরের সেমিতে যাওয়া তাদের ক্রিকেট বিস্তারে রাখতে পারে বড় ভূমিকা।
এই দলটির সেরা ক্রিকেটার অধিনায়ক নাত্থাকান চান্থাম। গত দুই বছর ধরেই তিনি আছেন দারুণ ফর্মে। ২৬ বছর বয়সী এই ব্যাটার আইপিএলে খেলেছেন দুই মৌসুম। খেলেছেন ফেয়ারব্রেক ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টও। এবার নারী এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে চান্থাম ৬১ রান করে প্রায় একাই জিতিয়েছেন থাইল্যান্ডকে।
সেই জয়ের পর এক সাক্ষাৎকারে থাইল্যান্ড ক্রিকেট দলটির অধিনায়ক নাত্থাকান চান্থাম বলেছিলেন, ‘এই টুর্নামেন্টে আমরা অন্য দলগুলোর মতোই জেতার জন্য এসেছি। প্রতি ম্যাচে আমরা আমাদের শতভাগ দেব এবং শিখব। প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর সঙ্গে যত ম্যাচ খেলব, ততই নিজেদের এগিয়ে নিতে পারব। এশিয়া কাপটাকে আমরা এভাবেই দেখছি।’
