খাদ্যে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর ছুঁইছুঁই করছে। দুই মাস লুকোচুরির পর ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। যদিও গড় মূল্যস্ফীতির তথ্য গণমাধ্যমে আগেই প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। একইভাবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা (একনেক)-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তিনি।
সাধারণত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রতি মাসেই মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করে। আগস্টে জ¦ালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে চলতি অর্থবছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতি প্রকাশ করেছে বিবিএস। যদিও প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে এখনো প্রকাশ করা হয়নি এ তথ্য।
সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে তা কিছুটা কমে সেপ্টেম্বরে এসে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। তা গত ১৩৫ মাস (১১ বছর ৩ মাসের) মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল আগস্টের মূল্যস্ফীতি।
অথচ বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জুলাই মাসেও গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর আগে জুন মাসে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে। আর জুলাইয়ে তা আরও বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ১৯ শতাংশে। কিন্তু আগস্টে হঠাৎ জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ায় তার প্রভাব পড়েছে দেশের সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর।
সাধারণত বিবিএস প্রতি মাসের মূল্যস্ফীতি তার পরবর্তী মাসের ২০ তারিখের মধ্যে দিয়ে থাকে। কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে আছে। আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে তা কিছুটা কমে সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১০ শতাংশে। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে মূল্যস্ফীতি আবার কমে যাবে। তখন নতুন চাল ও শাকসবজি বাজারে আসতে শুরু করবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ঋণ হ্রাসসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ভালোভাবে কাজ করছে।’
একই দিন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়েছে জুলাই মাসের তুলনায়, তবে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তাই সামনের দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও কমবে বলে আশাবাদী আমরা।’
একনেক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সার্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। তবে এখন মূল্যস্ফীতি কমতির দিকে। সামনে তা আরও কমবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে এখন বাজারে চালের দাম কমছে। মানুষ না খেয়ে নেই। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হচ্ছে। খুব বড় দুর্ঘটনা না ঘটলে আশা করি আমাদের মূল্যস্ফীতি সামনের দিনগুলোতে আরও কমবে।’
তবে বিবিএসের পরিসংখ্যান বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে। যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৩৬ শতাংশে, যা তার আগের মাসে অর্থাৎ আগস্টে ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর সেপ্টেম্বর মাসে শহরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ।
এ ছাড়া গ্রামে আগস্ট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ১৩ শতাংশ। যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশে। যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ।
অবশ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার পক্ষে সাফাই গেয়ে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, ‘বিশ্বে বড় বড় অর্থনীতির দেশও মূল্যস্ফীতির শিকার। যেমন আমেরিকার মতো দেশেও ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। আগামী ২০২৩ সালে ১৩ শতাংশ হতে পারে বলেও আগাম ধারণা দেওয়া হয়েছে ওই দেশে। সে তুলনায় আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন পর্যন্ত খুবই সন্তোষজনক। আশা করি সামনের দিনে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।’
