ব্রিটিশ রাজপরিবারের সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় বধূ ছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানা। তার রাজকীয় বিয়ের বেদনাদায়ক বিচ্ছেদ ও মর্মান্তিক মৃত্যু মানুষের কাছে অপরাধী করে তুলেছিল একজনকে। তিনি ক্যামিলা পার্কার বোলস, আজকের ব্রিটেনের কুইন কনসর্ট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি সাধারণ ব্রিটিশদের মনোভাব পরিবর্তন হয়েছে। রাজা তৃতীয় চার্লসের স্ত্রী হিসেবে গড়ে উঠছে নতুন ভাবমূর্তি। লিখেছেন নাসরিন শওকত
ক্যামিলা পার্কার
১৯৪৭ সালে লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে জন্ম নেন ক্যামিলা রোজমেরি শ্যান্ড। তিনি ধনী পরিবারের সন্তান। ক্যামিলা তার বাবা ব্রুস শ্যান্ড ছিলেন ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর একজন মেজর। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর যিনি ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। আর মা ছিলেন রোজালিন্ড কিউবিট। যিনি সে সময়ের অভিজাত এক ব্রিটিশ পরিবারের মেয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজসেবী। তার এক ভাই ও এক বোন ছিল। ১৯৪৭-এর নভেম্বরে ক্যামিলাকে পূর্ব সাসেক্সের সেন্ট পির্টারস চার্চে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করা হয়।
ক্যামিলার শৈশব কেটেছে পূর্ব সাসেক্সের প্লামটনের কাউন্টি হাউজ ও সাউথ কেসিনটনের পারিবারিক বাড়িতে। উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন ক্যামিলা। বাবার অনুপ্রেরণায় বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে তার। পড়ার পাশাপাশি সময় কাটত সঙ্গী কুকুর ও বেড়ালকে নিয়ে। ক্যামিলার যখন বয়স ৫, তখন তাকে ডিচলিং গ্রামের ডাম্বরেলস স্কুলে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে ১০ বছর বয়সে সাউথ কেসিনটনের কুইন্স গেট স্কুলে পড়া শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে এই স্কুল থেকে ও-লেভেল পাস করেন ক্যামিলা। ১৬ বছর বয়সে তাকে তার বাবা-মা সুইজারল্যান্ডে এ-লেভেল পড়তে পাঠান। সেখানে তিনি তোলোচেনাজের মন ফার্টাইল ফিনিশিং স্কুলে ভর্তি হন। সুইজারল্যান্ড থেকে এ-লেভেল পাস করার পর ক্যমিলা নিজের মতো করে ফ্রান্সে গিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। এবার ফ্রান্সে গিয়ে লন্ডন বিশ^বিদ্যালয়ের প্যারিস শাখায় ফরাসি সাহিত্যে পড়া শুরু করলেন ক্যামিলা।
১৯৬৫ সালে লন্ডনের বাড়িতে ফেরেন ক্যামিলা। এবার নিজের মতো করে একা থাকা শুরু করেন । তখনই ওয়েস্ট এন্ডের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেন। পরে মেফেয়ারের ডেকোরেশন ফার্মে অভ্যর্থনাকারী হিসেবে নিযুক্ত হন। ঘোড়সওয়ার হিসেবেও পারদর্শী ছিলেন ক্যামিলা। চিত্রকলার প্রতিও অনুরাগ ছিল। এ ছাড়া মাছ ধরা ও বাগান করার প্রতিও তার আগ্রহ ছিল বেশ। ১৯৬০ সালে ক্যামিলার সঙ্গে পরিচয় হয় তৎকালীন রাজপরিবারের অশ^ারোহী বাহিনী ‘ব্লুজ অ্যান্ড রয়্যালসর’-এর লেফটেনেন্ট অ্যান্ড্রু পার্কার বোলসের সঙ্গে।
কয়েক বছর ধরে এই আছি এই নেই ধরনের সম্পর্ক চলে তাদের মধ্যে। পরে ১৯৭৩ সালে এই জুটির বাগদানের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই বছরের ৪ জুলাই লন্ডনের ওয়েলিনটন ব্যারাকের গার্ডস চ্যাপেলে ক্যাথলিক প্রথায় বিয়ে করেন অ্যান্ড্রু ও ক্যামিলা। তখন ক্যামিলার বয়স ছিল ২৫ আর অ্যান্ড্রুর ৩৩। উইল্টশায়ারে বাড়িতে নতুন দাম্পত্য জীবন শুরু করেন এই দম্পতি। তাদের দুটি সন্তানও হয়। বিয়ের ২১ বছর পর ১৯৯৪ সালে ক্যামিলা ও অ্যান্ড্রু দম্পতি বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেন। পরের বছর আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। কিন্তু এই বিচ্ছেদের আগেই ১৯৭০ সালে অ্যান্ড্রু ক্যামিলার সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতি ঘটান এবং চার্লসের বোন প্রিন্সেস অ্যানকে বিয়ে করেন।
ভালোবাসার পরীক্ষা
তৃতীয় রাজা চার্লসের স্ত্রী হিসেবে ক্যামিলা এখন যুক্তরাজ্যের রানী। এ ছাড়া কমনওয়েলথভুক্ত আরও ১৪টি দেশেরও রানী তিনি। এ বছরের ৮ সেপ্টেম্বর চার্লসের মা রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যু হয়। ওইদিনই চার্লস ব্রিটিশ রাজ সিংহাসনে আরোহণ করলে স্ত্রী ক্যামিলা আনুষ্ঠানিকভাবে কুইন কনসর্ট হন। আমরা যদি গত শতকের শেষের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব একসময় তিনি যার স্থান কেড়ে নিয়েছিলেন, সেই ডায়ানা তাকে ‘র্যাটউইলার’ (কালো কুকুর) বলে সম্বোধন করেছিলেন। আর আজ সেই ক্যামিলাই নতুন রাজা চার্লসের দ্বিতীয় স্ত্রী। কামিলা কখনোই সেভাবে ব্রিটিশ জনগণের মন জয় করতে পারেননি, ভাগ্যের জোরে এখন কুইন কনসর্ট। যে পদবি পাওয়ার কথা ২৫ বছর আগে, সেটা হলো এখন। আগে যা হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ব্রিটিশ রাজপরিবার ও জনগণের কাছে চার্লস, ডায়ানা এবং ক্যামিলা এক আলোচনা ও আগ্রহের জগৎ। সেখানে ক্যামিলা ছিলেন ঘৃণিত। সেখান থেকে একটু একটু করে বেরিয়ে আসছেন তিনি। যখন ১৯৯৭ সালে দুনিয়া জুড়ে মানুষের প্রিয় এবং আকর্ষণীয় নারী চার্লসের প্রথম স্ত্রী প্রিন্সেস ডায়ানা ৩৬ বছর প্যারিসে কার দুর্ঘটনায় মারা যান, তখন ক্যামিলাকে ব্রিটেনের সবচেয়ে ঘৃণিত নারী হিসেবে গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বিশ্ব মিডিয়ায় যেভাবে ক্যামিলাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে তাতে কোনোভাবেই চার্লস এবং ক্যামিলার বিয়ে হওয়ার কথা নয়। রাজপরিবার এ ঘটনায় ছিল কিছুটা বিরক্ত। অথচ আজ সেই ক্যামিলাই হলেন রাজরানী।
ক্যামিলার সঙ্গে সম্পর্ক ও রাজপিরবারের নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করেন চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানা ১৯৯২ সালেই আলাদা হয়ে যান। এর চার বছর পর ১৯৯৬ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এই বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে ডায়ানা ‘রাশভারী’ ও ‘রুচিহীন’ হিসেবে ক্যামিলাকে প্রায়ই গালমন্দ করতেন। বাস্তবতা এখন ভিন্ন। বহু বছর পর ৭৫ বছর বয়সী সেই ক্যামিলাকেই চার্লসের ফটোজেনিক প্রথম স্ত্রীর (ডায়ানা) সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। প্রিন্সেসের মৃত্যুর পর প্রায় ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে ক্যামিলাকে। ২০০৫ সালে চার্লস ও ক্যামিলা বিয়ে করেছেন। তারপর থেকেই তিনি রাজপরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। যদিও এতে বিরক্তিও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। স্বামী চার্লসের ওপর তার শান্ত প্রভাব যুবরাজ হিসেবে তার ভূমিকা পালনে সহায়তা করেছে বেশ। এর আগে গোপনে রেকর্ড হওয়া একটি টেলিফোন কথোপকথন ১৯৯৩ সালে প্রকাশ হয়। যেখানে ক্যামিলাকে চার্লসের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘আমি তোমার জন্য যেকোনো যন্ত্রণা সইতে পারি, এর নামই ভালোবাসা। এটাই আমার ভালোবাসার শক্তি।’
চার্লসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও বিয়ে
তবে জানা যায়, ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুবরাজ চার্লসের সঙ্গে দেখা হতো ক্যামিলার। যেহেতু তাদের দুজনের বন্ধুমহল ছিল একই । তবে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় হয়নি। রাজপরিবারের জীবনীকার ব্রান্ডরেথের বর্ণনা অনুযায়ী, চার্লস ও ক্যামিলার বন্ধু ছিলেন লুসিয়া সান্তা ক্রুজ। তার বাড়িতে প্রথমবারের মতো চার্লস ও ক্যামিলাকে তিনি পরিচয় করিয়ে দেন। যে পরিচয় গভীর বন্ধুত্বে রূপ নেয় এবং ঘটনাক্রমে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কও গড়ে ওঠে। যে সম্পর্ক তাদের বন্ধুমহলে পরিচিতি পায় । এই জুটি তখন প্রায়ই উইন্ডসরের গ্রেট পার্কের পোলো খেলার ছলে মিলতেন। ক্যামিলা ও চার্লসের সম্পর্ক যখন আরও গভীর হয়ে ওঠে, তখন চার্লস ক্যামিলার বাবা-মায়ের সঙ্গে প্লামটনে সাক্ষাৎ করেন। এর পরপরই ক্যামিলাকে রাজপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন চার্লস। ১৯৭৩ সালের শুরুর দিকে চার্লস সামরিক বাহিনীর রয়্যাল নেভিতে যোগ দিতে দেশের বাইরে চলে যান। সে সময় চার্লস ও ক্যামিলার সম্পর্কে ছেদ পড়ে, এরপর হঠাৎ করেই তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। তখনই অ্যান্ড্রু পার্কার বোলসকে বিয়ে করেন ক্যামিলা। কোনো কোনো সূত্র এমন দাবি করে থাকে, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ক্যামিলার সঙ্গে চার্লসের সম্পর্ককে মেনে নেননি। কারণ তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু লেডি ফারময়-এর স্পেনসার পরিবারের নাতনিদের একজনরে সঙ্গে যুবরাজ চার্লসকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তবে রাজপরিবারের জীবনীকারদের বেশির ভাগই এ বিষয়ে একমত হন যে, তখন ক্যামিলাকে বিয়ে করার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়নি। জীবনীকার জোনাথন ডিম্বলবি বলেছেন যে, এই জুটি একসময়ের ডেটও করেছেন। চার্লস সে সময় বিয়ের কথা ভাবছিলেনও, কিন্তু এত বড় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নিজেকে খুব কম বয়সী মনে করছিলেন নিজেকে। তবে ১৯৭৯ থেকে ৮০ সালে মধ্যে চার্লস ও ক্যামিলার মধ্যে আবার প্রেম শুরু হওয়ার গুঞ্জন ওঠে তাদের বন্ধুমহলে। তা সত্ত্বেও চার্লস শিগগিরই লেডি ডায়ানা স্পেনসারের সঙ্গে সম্পর্ক জড়ান ও বিয়েও করেন দুজনে।
প্রেম ও পরিণতি
ত্রিশ বছরের তরুণ ওয়েলসের যুবরাজ চার্লসের পরিচয় ছিল অনেকটা প্লেবয়ের মতো। ১৯৭৭ সালে লেডি ডায়ানা স্পেনসারের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় চার্লসের। ডায়ানার তখন বয়স ১৬। আর যুবরাজ চার্লস ছিলেন তার থেকে ১৩ বছরের বড়। সে সময় ডায়ানার বড় বোন সারার সঙ্গে ডেট করছিলেন চার্লস। এরপরের দুই বছরে তাদের দুজনের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তেমন। কিন্তু ১৯৮০ সালে হঠাৎ করেই চার্লস ও ডায়ানার বাগদানের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর ১৯৮১-এর ফেব্রুয়ারিতে যুবরাজ চার্লস ও লেডি ডায়ানার বাগদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই বছরের ২৯ জুলাই সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে যুবরাজ চার্লস ও লেডি ডায়ানার বিয়ে হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত রাজপরিবারের এই বিয়ের অনুষ্ঠান বিশ^জুড়ে ব্যাপক সাড়া তোলে । কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই জুটির সম্পর্কের ব্যবধানের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে।
বিয়ের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে যুবরাজ চার্লস ও রাজকুমারী ডায়ানার ঘর আলো করে জন্ম নেন যুবরাজ উইলিয়াম। এরপর ১৯৮৪ সালে দ্বিতীয় যুবরাজ হ্যারির জন্ম হয়েছিল। এই দম্পতির বিয়ের নয় বছর পার না হতেই চার্লসকে ঘিরে ত্রিভুজ প্রেমের গুঞ্জন শুরু হয়। এর পাঁচ বছরের মধ্যে চার্লস ডায়ানার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এই কেলেঙ্কারি সে সময় চার্লসের ভাবমূর্তিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ডায়ানার সঙ্গে চার্লসের বিয়ের এক দশক পরে এই ত্রিভুজ প্রেমের ঘটনাটি প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমে প্রচারণা পায়। যখন ১৯৯২ সালে ডায়ানা : ‘হার ট্রু স্টোরি’ বই প্রকাশ হয়। পরের বছর ১৯৯৩ সালে ‘ক্যামিলাগেট’ টেপ কেলেঙ্কারি প্রকাশ পায়। যেখানে যুবরাজ চার্লসের সঙ্গে ক্যামিলার অন্তরঙ্গ কথোপকথন গোপনে টেপ করা হয়েছিল। এরপরই ওই কথোপকথন ট্রান্সক্রিপ্ট আকারে ট্যাবলয়েডগুলোতে প্রকাশিত হয়, যা চার্লসের ভাবমূর্তিকে ভীষণভাবে ক্ষুণ করে।
১৯৯৪ সালে রাজপরিবারের অন্দরের এই কাহিনী প্রথম জনসম্মুখে তুলে ধরেন বিদ্রোহী রাজবধূ ডায়ানা। তিনি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তার স্বামীর সঙ্গে ক্যামিলার সম্পর্ক চলার বিষয়টি নিয়ে প্রথম কথা বলেন। এর আগে ‘চার্লস দ্য প্রাইভেট ম্যান, দ্য পাবলিক রোল’ নামে আরেক সাক্ষাৎকারে চার্লস তার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকারও করেছিলেন। সাধারণ ব্রিটিশদের মুখে মুখে প্রচারিত এই গল্প রূপকথার রূপ নিয়েছিল সে সময়।
১৯৮৬ সালে ক্যামিলার সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৯৬ সালের ২৮ আগস্ট চার্লস ও ডায়ানা ‘অনিষ্পত্তিযোগ্য পার্থক্য’ থাকার কথা জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করেন। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট প্রেমিক ডোডি আল-ফায়েদের সঙ্গে প্যারিসে একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যু হয় ডায়ানার।
কুইন কনসর্ট হয়ে ওঠা
ডায়ানার মৃত্যুর পর রাজপরিবার আবারও ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। তবে চার্লস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেন। তখন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে নতুন ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে তৎপর হন। এজন্য সাধারণ ব্রিটিশদের কাছের হয়ে ওঠার চেষ্টাও করেন। পাশাপাশি সন্তানদের যতœবান বাবা হয়ে উঠতেও দেখা যায় তাকে। ২০০৫-এর ১০ ফেব্রুয়ারি। রাজপরিবারের ক্লারেন্স হাউজ ঘোষণা দেয়, ওয়েলসের যুবরাজ চার্লস ও তার প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার বোলসের বাগদান সম্পন্ন হয়েছে। চার্লস রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী একটি হীরার আংটি (তার নানি যে আংটি তার মাকে দিয়েছিলেন) পরিয়ে দেন ক্যামিলার আঙুলে। এর দুই মাস পরে ৮ এপ্রিল উইন্ডসর প্রাসাদের সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে যুবরাজ চার্লস ও তার ৩৫ বছরের প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার বিয়ে করেন। রাজকীয় পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে বেসরকারি এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ে হয় এই যুগলের। যে বিয়ের মধ্য দিয়ে মিসেস পার্কার বোলস হন ডাচেস অব কর্নওয়েল।
বিয়ের পরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ক্যামিলার রাজপরিবারের স্থায়ী সদস্য হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসনে আরোহণের ৭০তম বার্ষিকীতে অবশেষে তার ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে চলা সন্দেহের অবসান ঘটে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেই এলিজাবেথ কুইন কনসোর্ট উপাধি দিয়ে ক্যামিলাকে আশীর্বাদ করেন। রানী এলিজাবেথ বলেছিলেন, আমার ‘আন্তরিক ইচ্ছা’ ছিল সে এই দায়িত্ব পালন করুক। তখন যুবরাজ চার্লসও মায়ের ইচ্ছের সঙ্গে সহমত জানিয়ে বলেন, ‘যেহেতু আমাদের দুজনকে মহামান্য রানী ও আমাদের সমাজের মানুষদের সেবা ও সহযোগিতা করার জন্য একসঙ্গে করা হয়েছে, তাই আমার প্রিয় স্ত্রী সব সময় পাশে থেকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে চলেছেন।’ পরে রাজা তৃতীয় চার্লস সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি হয়েছেন কুইন কনর্সট।
ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার
ডায়ানার মৃত্যুর পর বছরের পর বছর ধরে সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত নেতিবাচক গল্পের কারণে কলঙ্কিত হয় রাজপরিবারের খ্যাতি। ক্ষুণœ হওয়া এই ভাবমূর্তি পুনঃনির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয় রাজকীয় ‘এইড’দেরকে। এরপর ধীরে ধীরে তারা ওয়েলসের যুবরাজ চার্লসের স্ত্রী ক্যামিলাকে জনমুখী কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কাজ শুরু করে। যাতে তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। প্রথমবারের মতো চার্লস ও ক্যামিলাকে একসঙ্গে জনসম্মুখে দেখা যায় ১৯৯৯ সালে। লন্ডনের রিজ হোটেলে ক্যামিলার বোনের জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে। এই জুটির বিয়ের পরের বছরগুলোতে ক্যামিলাকে ঘিরে হওয়া সংবাদ মাধ্যমের সমালোচনাগুলোও যেন বাসি হতে থাকে। কারণ ততোদিনে তিনি রাজপরিবরের একজন প্রতিষ্ঠিত সদস্য হয়ে উঠেছেন। রাজপরিবারের পর্যবেক্ষকরা ক্যামিলার সম্পর্কে বলেছেন, তার সঙ্গে দেখা করতে আসা অতিথিদের তিনি মন জয় করতে পেরেছিলেন তার পরিমিত রসবোধ দিয়ে। ২০১৩ সালে ক্যামিলা তার স্বামী চার্লস- এর সঙ্গে পার্লামেন্টের রাষ্ট্রীয় উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেন। জনসংযোগ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রিন্সেস ক্যামিলার প্রচারণা দলের জন্য তখন কাজটি বেশ কঠিন ও জটিল ছিল। তবে রাজকীয় এইড দলের সদস্যরা বলেছেন ক্যামিলার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের গুণেই এই কঠিন কাজটি করা সম্ভব হয়েছে। তা সত্ত্বেও ক্যামিলা কখনোই ব্যাপক আকারের জনসমর্থন অর্জন করতে পারেন নি। ২০২২ সালে ইউগভের একটি নিয়মিত জরিপে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ২০ শতাংশ মনে করেন ক্যামিলার রানী হওয়া উচিত। আর ৩৯ শতাংশ মনে করেন তার প্রিন্সেস হিসেবে কনসর্ট পদবি পাওয়া উচিত। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে কুইন কনসর্ট হতে সহায়তা করার পর ডেইলি মেইল একটি জরিপ পরিচালনা করে। সেখানে ৫৫ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ক্যামিলার কুইন কনসর্ট হওয়াকে সমর্থন করেছেন।
