মাদারীপুরের পুরান বাজার এলাকার বাসিন্দা রেজাউল আমিন মোল্লা দক্ষিণ আফ্রিকার কুমুতলাং শহরে নিজের মুদিদোকান থেকে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর অপহৃত হন। মুক্তিপণ হিসেবে বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে ৩০ লাখ টাকা দাবি করে একটি চক্রটি। দুই দফায় ১১ লাখ টাকা দিলেও আজও রেজাউলকে ফেরত পাননি তারা। রেজাউল ছাড়াও গত ২৬ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনিয়া এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন ১০ বাংলাদেশি।
নোয়াখালীর সিংবাহুড়া এলাকার বাসিন্দা মো. ইউসুফ গ্রিসে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে অপহৃত হন। অপহরণকারী চক্রটি ইউসুফের পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ইউসুফকে মুক্তি দেয় চক্রটি। একই বছরের আগস্টে ইরাকে অপহৃত হন কিশোরগঞ্জের শ্রীমন্তপুরের আবু তাহেরের ছেলে মাজহারুল ইসলাম। তার পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে মাজহারুলকে ছাড়ে তারা। সর্বশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের সোহেল মিয়াকে মালয়েশিয়ার সেরি কেম্বানগান তামিলজায়ার বাসার নিচ থেকে স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে অপহরণকারীরা তুলে নিয়ে যায়। এরপর ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়েও তাকে হত্যা করে চক্রটি।
রেজাউল, ইউসুফ, মাজহারুল ও সোহেলের মতো অসংখ্য প্রবাসী অপহরণ-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও দেশের স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দাবি করছে মুক্তিপণ। কাক্সিক্ষত মুক্তিপণ না পেলে হত্যার শিকারও হচ্ছেন অনেকে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্তে নেমে দেখা যাচ্ছে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশিই এসব অপহরণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন সময় অপহরণের শিকার প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। লিবিয়ায় অপহরণের শিকার কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদের ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে লিবিয়া থেকে ইউরোপে নেবে বলে প্রতিশ্র্রুতি দেয় চক্রগুলো। পরে তাদের আটকে রেখে বাংলাদেশে স্বজনদের কাছ থেকে বিকাশে ও ব্যাংক হিসাবে টাকা নিয়েছে। এমন ভুক্তভোগী অনেকে আমাদের কাছে অভিযোগও করেন না। এ বিষয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করলেও দুঃখের বিষয়, কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।
বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের অপহরণের সঠিক হিসাব নেই কারও কাছে। মুক্তিপণের টাকা দেওয়ার পর অনেক ভুক্তভোগীর স্বজনেরা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করছেন। যেসব ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছে অপহরণকারী চক্র, তার সূত্র ধরে একাধিক অপহরণকারী চক্র শনাক্তও করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এসব ঘটনায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলাও হচ্ছে। এরপরও থামছে না প্রবাসী অপহরণ-মুক্তিপণ আদায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশির ভাগ ভুক্তভোগীর পরিবার মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে ভয়ে কাউকে বিষয়টি জানায় না। আবার যারা চক্রের বাংলাদেশি সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন, তাদের অনেকে কোনো সহায়তা পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিরলসভাবে কাজ করা প্রবাসীদের অপহরণ-মুক্তিপণ আদায় ক্রমেই উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। দেশের স্বজনেরা প্রতিনিয়ত থাকছেন উৎকণ্ঠায়।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, লিবিয়া, ইরাক, ইরান, মালয়েশিয়াসহ বেশ কিছু দেশে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়ায় অপহরণ করে মুক্তিপণের টাকা না পেলে হত্যার ঘটনা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব অপহরণের সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
বিদেশে অপহরণ করে দেশে স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের একাধিক ঘটনার তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে পুলিশের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় সেসব স্থানে সময়মতো ও যথাযথ আইনি সহায়তা পান না ভুক্তভোগীরা। যদি দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে অপহরণকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যেত তাহলে অপহরণের ঘটনা কমে আসত। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। তাদের এমন দাবির যৌক্তিকতার বিষয়ে বলছেন, বিশ্বের যেসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক ও প্রবাসী রয়েছেন, সেই সব দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে লিয়াজোঁ অফিসারের দায়িত্ব দিতে হবে পুলিশকে। কারণ প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা ধরনের জটিলতা ও মামলার মারপ্যাঁচে পড়ে ভোগান্তির শিকার হন।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অপহরণের শিকার রেজাউলের স্বজনরা অভিযোগ করেন, তারা মামলা করেও পুলিশের সহায়তা পাননি। দুই দফায় চক্রের বাংলাদেশি সদস্যদের কাছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় গিয়ে ১১ লাখ টাকা দিলেও আজও রেজাউলকে ফেরত পাননি তারা। এ ঘটনায় অপহরণকারী চক্রের বাংলাদেশি চার সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ জানতে পারে রেজাউলকে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্যে রেজাউলের হাড়গোড়ও উদ্ধার করে পুলিশ। তবে সেই হাড়গোড়গুলো রেজাউলের কি না, তা নিশ্চিত হতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বজনদের সঙ্গে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
রেজাউলের ভাই মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছয় মাস আগে আমরা ডিএনএ নমুনা দিয়েছি। কিন্তু উদ্ধার হওয়া হাড়গোড় আমার ভাইয়ের কি না, তা আজও নিশ্চিত হতে পারি নাই। দেশের পুলিশও আমাদের আর কিছুই জানায়নি।’
এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় মাসুদের করা মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওয়ারী বিভাগ। মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. আজহারুল ইসলাম মুকুল গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ের রিপোর্ট এখনো পাইনি। ইন্টারপোলের কাছ থেকে রিপোর্ট পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গ্রিসে অপহরণের শিকার মো. ইউসুফের মা সালমা বেগম ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর ব্র্যাক ব্যাংকের ঢাকার আশকোনা শাখায় সবুজ মিয়া নামের এক ব্যক্তির হিসাব নম্বরে মুক্তিপণের ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা জমা দেন। ইউসুফের মুক্তির পর সালমা বেগমের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টির তদন্তে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম শাখা।
সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অবৈধ পথে দালালের মাধ্যমে গ্রিসে প্রবেশের সময় অপহরণকারী চক্রের হাতে পড়েন ইউসুফ। তিনি ওই দালালদের মাধ্যমে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। প্রবাসী সাইফুর আকন ওরফে নাসির অপহরণকারী চক্রের অন্যতম হোতা। তিনি মাদারীপুরের শিবপুরের আব্দুল হক আকনের ছেলে। তার দুই সহযোগী বাংলাদেশে অবস্থানকারী সবুজ মিয়া ও আমিনুল ইসলাম। সবুজ সাইফুলের শ্যালক। অপহরণের পর ইউসুফের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা নেয় সবুজের ব্র্যাক ব্যাংক হিসাবে। সবুজের ব্যাংকের হিসাব বিবরণী নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে সিআইডি জানতে পেরেছে, ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মো. আমিনুল ২৬ লাখ ৫১ হাজার টাকা জমা করেছে হিসাবটিতে। আমিনুলের বড় ভাই মামুন আলীও গ্রিসে থাকেন। এ চক্রটি অপহরণসহ দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। চক্রের এই তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে সিআইডি।
মাজহারুল ইসলামের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভাটারা থানায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে সিআইডি। সম্প্রতি সাতজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে সংস্থাটি। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশি প্রবাসী বাছেদ ওরফে রাশেদ, সানোয়ার ওরফে রানা ও দিদারের সহযোগিতায় মাজহারুলকে ইরাকের কুর্দিস্থান শহরের কিরকুক এলাকা থেকে অপহরণ করে একটি চক্র। এই চক্রের হোতা বাংলাদেশি প্রবাসী সুলতান ওরফে আলম। অন্যরা তার সহযোগী।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অপহরণ মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রবাসে বাংলাদেশি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনার তদন্তে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে যান, তারাই ভুক্তভোগী হন। এসব দালাল টাকার বিনিময়ে স্থল-নদীপথে ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে মূলত চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়।
