দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হলে শিক্ষার্থীসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানে প্রভোস্ট বা প্রাধ্যক্ষ (শিক্ষার্থী নিবাসপ্রধান) নিয়োগ দেন উপাচার্যরা। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, প্রভোস্টদের ক্যাম্পাসে অবস্থানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি)। ঘড়ির কাঁটা ৪টা ছুঁলেই এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্টরা ক্যাম্পাস ছেড়ে রওনা হন তাদের কুষ্টিয়া বা ঝিনাইদহ শহরের নিজ নিজ বাসার পথে। আর এতে রাত হলেই নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আবাসিক শিক্ষার্থীদের। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
তবে প্রভোস্টরা বলছেন, আবাসিক হলে তাদের অবস্থানের বিধান থাকলেও সেখানে থাকার মতো উপযুক্ত পরিবেশ নেই। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রভোস্টদের ক্যাম্পাসমুখী করতে চেষ্টা চালাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্ণাঙ্গ আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার চার দশকেও পূর্ণাঙ্গ আবাসিক হয়নি এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে আটটি আবাসিক হল। এর মধ্যে মেয়েদের জন্য তিনটি আর ছেলেদের পাঁচটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি। তাদের মধ্যে আটটি আবাসিক হলে আট হাজারের মতো শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা রয়েছে। আর আটটি হলে প্রভোস্ট ও আবাসিক শিক্ষক রয়েছেন ৪৮ জন।
ইবির একাধিক আবাসিক হলের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানান, মাঝেমধ্যে হল পরিদর্শনে আসেন হল প্রভোস্টরা। হলের ডাইনিংয়ে খাবারের মান, ইন্টারনেটের ধীরগতি ও পানির সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এসব সমস্যার সমাধানে উদাসীন হল কর্র্তৃপক্ষ। অনেক সময় প্রভোস্টদের একটি স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে রাত হলেই হলের শিক্ষার্থীরা অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে। রাতে হলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আবাসিক শিক্ষকসহ হল প্রভোস্টদের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা মেলে না।
জানা গেছে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল এবং লালন শাহ হলের দক্ষিণ ব্লকের পাশে ছয়টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে দুই হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শিক্ষার্থীরা হল দুটির প্রভোস্টদের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু রাত গভীর হওয়ায় কল রিসিভ করেননি তারা।
এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে দেশরতœ শেখ হাসিনা হলের এক ছাত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন ওই ছাত্রীর সহপাঠীরা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য হল প্রভোস্ট, আবাসিক শিক্ষক ও দায়িত্বরত কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কেউই কল রিসিভ করেননি। অচেতন অবস্থায় ওই ছাত্রীকে কমপক্ষে ৩০ মিনিট অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। এরকম ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে হলগুলোতে। এ ছাড়াও হলগুলোতে থাকার সিট (শয্যা) নিয়ে প্রায়ই হয় মারামারি। এর বাইরে ইন্টারনেটের ধীরগতি, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং হলের ডাইনিংগুলোতে নিম্নমানের খাবার পরিবেশনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। তবে এসব অভিযোগ শুধু খাতায় লিপিবদ্ধ হয়, মেলে না স্থায়ী সমাধান। আর এ জন্য হলগুলোর প্রভোস্ট ও আবাসিক শিক্ষকদের হলে অনুপস্থিতিকে দায়ী করছেন শিক্ষার্থীরা। অথচ নিয়ম অনুযায়ী প্রভোস্টদের ক্যাম্পাসে অবস্থান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাদের নিয়োগপত্রেই এটা উল্লেখ থাকে। হলে না থাকলেও ক্যাম্পাসে থাকতে হবে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, সাদ্দাম হোসেন হল, শহীদ জিয়াউর রহমান হল, লালন শাহ হল এবং শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রভোস্টরা পরিবার নিয়ে থাকেন ক্যাম্পাস থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরের কুষ্টিয়া শহরে। অন্যদিকে শেখ রাসেল হল, শেখ হাসিনা হল এবং খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্টরা থাকেন ক্যাম্পাসে থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরের ঝিনাইদহ শহরে। ফলে বিকেল পেরোলেই কোনো বিপদে পড়লে এই আট হলের শিক্ষার্থীদের প্রভোস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় মোবাইল ফোনে। আর কিছু আবাসিক শিক্ষক ক্যাম্পাসে অবস্থান করলেও বিপদের সময় তাদের পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেখ হাসিনা হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। রাতে কেউ অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য প্রভোস্টের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রভোস্ট স্যার থাকেন শহরে। একইভাবে আবাসিক শিক্ষকদেরও আমরা পাই না। ফলে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে আমাদের। হলে একজন হলেও আবাসিক শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি আমরা।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হলের নানান সমস্যার কথা অভিযোগ খাতায় লিপিবদ্ধ করে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সপ্তাহ পেরোলেও তার সমাধান হয় না। এ ছাড়াও হলে ইচ্ছেমতো খাবারের দাম বাড়ানো হয়। এসব বিষয়ে আমরা ফলপ্রসূ প্রতিকার পাই না। ৪টা বাজলেই কর্মকর্তারা বাড়ির পথে রওনা হন। এ জন্য আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে একজন হলেও অভিভাবক থাকা দরকার।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হল প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি ড. ইয়াসমীন আরা সাথী বলেন, ‘আবাসিক হলে শিক্ষকদের থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু হলগুলোতে শিক্ষকদের থাকার মতো পরিবেশ নেই। হলে না থেকেও আমরা শিক্ষার্থীদের সব সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে হলে আবাসিক শিক্ষকরা থাকতে পারলে আরও ভালো হতো।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রভোস্টদের ক্যাম্পাসমুখী করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। মূলত ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে শিক্ষকরা শহরমুখী। এ থেকে বের হওয়ার জন্য আমি প্রত্যেক মিটিংয়ে হল প্রভোস্টদের উদ্বুদ্ধ করি।’
