মেট্রোরেল এলাকায় বায়ু-শব্দ দূষণ, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৩৯ এএম

ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬) অর্থাৎ ঢাকা মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশের উদ্বোধনের কথা রয়েছে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে। কাজও চলছে পুরোদমে। কিন্তু ওপরের কাজ ঠিকমতো চললেও এর শব্দদূষণ, ধুলোবালি ও নিচের রাস্তায় খানাখন্দের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে নগরের জনস্বাস্থ্য। সম্প্রতি প্রকল্পটি মনিটরিং করে এমন মত দিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পটি মনিটরিং করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে, প্রকল্প এলাকায় প্রচুর ধুলোবালি, শব্দের কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। প্রকল্প এলাকায় এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান যথাযথভাবে পালনের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণে যথাযথভাবে পানি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এতে আরও বলা হয়, মেট্রোরেলের করিডোর সংলগ্ন সড়কগুলোতে কোথাও কোথাও খানাখন্দ তৈরি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক নিয়মিত মেরামত করে যান চলাচলের উপযোগী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 অবশ্য আইএমইডির করা এ প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নন ডিএমটিসিএলের প্রকল্প পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, নিচে খানাখন্দ ঠিক করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আমরা চালু করতে পারব। সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মেট্রোরেল বা যেকোনো প্রকল্পের কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটতে পারে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে আলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে মেনে চলার জন্য তারা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ। তিনি বলেন, এখানে কর্তৃপক্ষেরও দায় আছে। তাদের সুপারভিশনের মাধ্যমে ঠিকমতো কাজ করছে কি না তাও দেখভাল করা উচিত। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত যে বিষয়গুলো সেটাও তাদের দেখভাল করার কথা। এগুলোর সুপারভিশন বাংলাদেশে কম হয়। মেট্রোরেলের ঠিকাদাররা অন্য দেশেও কাজ করেন। কিন্তু বাংলাদেশে সুপারভিশন কম হওয়ায় তারা সুযোগগুলো নেন। এ কারণে মেট্রোরেলের নির্মাণের সময় কয়েক মাস আগে একজন পথচারীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যেমন দায় আছে, আমাদের তদারকি প্রতিষ্ঠানেরও তেমন দায় আছে।

প্রাথমিকভাবে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও গত মাসে প্রকল্পটির ব্যয় ও মেয়াদ দুটোই বাড়ানো হয়েছে। সংশোধনের পর ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। ২০১২ সালের জুলাই থেকে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ শুরু হয়। শুরু থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ৫৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৫৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর সার্বিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ শতাংশে। তবে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশ পরবর্তী সময়ে যুক্ত হওয়ায় এ অংশ নির্মাণে প্রকল্পটি সংশোধন করার কারণে ব্যয় বাড়ছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।

বিভিন্ন ধকল কাটিয়ে দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি বেড়েছে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়। পরে যোগ হয় বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের কয়েকটি প্রকল্প। বেশিরভাগ বিদেশি ঋণের প্রকল্পগুলো দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নে অনিশ্চয়তার কারণে প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও সময়সীমা বেশ কয়েকবার সংশোধন করতে হয়েছে। তবে অর্থনীতির এ সংকটকালে মাঝখানে শ্লথগতি থাকলেও এখন কাজ চলছে পুরোদমে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প এখনো শেষ হয়নি

এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্পগুলোর একটি পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করা হলেও এটির কাজ শতভাগ শেষ হয়নি। ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৯৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৯৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আগামী জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ

৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটি। এটির বাস্তবায়ন মেয়াদ শুরু হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। শেষ হবে ২০২৪ সালের জুনে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৬৪ শতাংশ। একই সময়ে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২৫ হাজার ৩৪৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ৫৯ শতাংশে।

মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র

৫০ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটি প্রথম সংশোধনীর পর ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৫৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৬৬ দশমিক ১৮ শতাংশ।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প

১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট (রামপাল) বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৩ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এছাড়া ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু-মায়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে এই প্রকল্পটি। এর মেয়াদ শুরু হয় ২০১০ সালের জুলাই থেকে। ২০২৪ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৯৩৬ কোটি ৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, তবে ভৌত অগ্রগতির পরিমাণ অনেক বেশি প্রায় ৭৫ শতাংশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত