অর্থনীতির তত্ত্ব দিয়ে অর্থনীতিকে বিচার করা যায় না। উন্নয়ন তত্ত্ব দিয়েও অর্থনীতির বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। একটা দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নেপথ্যে সে দেশের মাইক্রো ও কৃষি অর্থনীতি কেমন তা দেখতে হবে। প্রত্যেক দেশেই কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে। দেশে অর্থনীতির চর্চা এতদিন মূল ধারায় ছিল না। এখন ধীরে ধীরে তা মূল ধারায় আসছে। গতকাল বিআইডিএস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘আকাক্সক্ষা সঞ্চারিত গতিপ্রেরণা : বাংলাদেশের উন্নয়ন পথরেখার বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহি চৌধুরী ও মাহির এ রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন।
ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ডগলাসের তত্ত্ব অনুযায়ী বাজার অর্থনীতি কাজ করে। বাংলাদেশের কিছু কিছু উন্নয়ন অন্য প্রতিবেশীদের তুলনায় আলাদা হয়েছে। যেমন মহিলাদের কর্মসংস্থান পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বেশি। আমরা সবচেয়ে বেশি সফল শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতির ট্রিগার পয়েন্ট আলাদা করা কঠিন।
তার মতে, বাংলাদেশে গরিবদের অর্থনীতি বাড়ার সুযোগ বেশি। গরিবরা ধনীদের জীবন ব্যবস্থা দেখে তাদের আকাক্সক্ষা বেড়েছে। তারাও চেষ্টা করেছে নিজেদের আর্থিক উন্নয়নের। ফলে প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। নিম্নবিত্ত মহিলারা বাইরে গিয়ে ব্যবসা শিখছে, এটা বড় পরিবর্তন। দেশে আকাক্সক্ষার যে পরিবর্তন তা মূলত ২০০০ সালের পর থেকে। মূলত সমাজে একজন আরেকজনকে দেখে নিজেদের পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, গরিব পরিবারের মহিলারা যেটাকেই ধ্যান-ধারণায় নিয়েছে সেটাকেই বাস্তবায়ন করেছে। সেটা স্যালাইন থেকে শুরু করে বড় উদ্যোক্তা পর্যন্ত। গরিব দেশের মানুষরা ধনী দেশের জীবনব্যবস্থা দেখে সেটাকে আকাক্সক্ষা হিসেবে নেয়। আর দেশের রাজনীতিবিদদের সমাজের সেবার আকাক্সক্ষা নিয়ে রাজনীতি করা উচিত। ব্যবসায়ীদের কাছেও একই প্রত্যাশা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মশিউর রহমান বলেন, আমরা নদীর পানি তখনই মাপি যখন ওই নদী পার হই। বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল একটি প্রত্যাশা থেকে। ষাটের দশকে ফিলিপাইন ও ব্রাজিল ছিল প্রতিশ্রুতিশীল রাষ্ট্র। কিন্তু উপনিবেশবাদের পর কিছু দেশ খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছে। তারপরও তার কীভাবে উন্নতি করছে তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে দুই তিন জেনারেশনের যে পরিবর্তন তা খুবই আনন্দদায়ক। ডগলাসের তত্ত্ব অনুযায়ী এসব জেনারেশনকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে হোপ হিসেবে। তবে দুঃখের বিষয়, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে আমরা ভালো করতে পারিনি। গবেষকরা এ নিয়ে আরও তাত্ত্বিক গবেষণা করতে পারেন।
গবেষণা প্রবন্ধে ড. তৌফিক-ই-ইলাহি বলেন, ব্যক্তি তার জীবনের গুরুত্ববহ সিদ্ধান্তগুলো নেয় তার পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যগুলোকে মাথায় রেখে। এই সিদ্ধান্তগুলো আবার সেই পরিবারের সামষ্টিক বস্তুগত (যেমন : আয়, রেমিট্যান্স, জমিজমা ইত্যাদি) ও অবস্তুগত সম্পদ-সম্পত্তির (যেমন : সন্তানের সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষা ইত্যাদি) ওপর নির্ভর করে। যখন পরিবারের এই ধরনের সম্পদ বৃদ্ধি পায়, তখন সেই পরিবারের নিজস্ব এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের আয় ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে, সম্পদ যদি সময়ের সঙ্গে বৃদ্ধি না পায়, স্থবির হয়ে থাকে তবে বিপরীত ফলও হতে পারে, অর্থাৎ পরিবারের আয় ও সমৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা অগ্রগতির লাগাম টেনে ধরতে পারে। তাই অনিশ্চয়তা হ্রাস করতে এবং ভবিষ্যতের প্রতি ভরসা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে একটি পরিবারের ভাগ্যের এই পরিবর্তন প্রক্রিয়া আরও উদ্দীপনা পায়।
তার গবেষণায় উঠে আসে, প্রযুক্তি জগতে ফেইসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো, গুগল, ইউটিউবসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলো ইতিমধ্যে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, রুচি ও পছন্দ অন্তর্ভুক্ত করে তাদের বাণিজ্যিক কলাকৌশল নির্ধারণ করছে। জাতীয় পর্যায়ের আয় এবং সমৃদ্ধি এই পরিবারগুলোরই সমষ্টি। সাধারণত, আকাক্সক্ষা সঞ্চারিত গতিপ্রেরণা যত বেশি হবে, জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি তত দ্রুত হবে। অর্থাৎ, প্রারম্ভিকভাবে কোনো দেশের মাথাপিছু আয় কম থাকলেও যদি দেশটির আকাক্সক্ষা সঞ্চারিত গতিপ্রেরণা বেশি হয়, তবে সেই দেশটি আয়ের দিক থেকে সমকক্ষ বা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অথচ কম গতিপ্রেরণা সম্পন্ন দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হবে (ওপরের গ্রাফটি দ্রষ্টব্য)। এই গতিপ্রেরণার ভিন্নতার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন যাত্রার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়।
ড. বিনায়ক সেন বলেন, সে দেশই সমৃদ্ধ হবে যে দেশের গরিবরা ধনী হওয়ার ভরসা রাখে। দেশে এখন পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট বেড়েছে। যেসব জাতির অবকাঠামো উন্নয়ন বেড়েছে সেখানে পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট এতটা বেড়েছে কিনা ভেবে দেখতে হবে। বিশ্বের রেনেসাঁ আন্দোলনগুলো গবেষণা করা উচিত।
তিনি বলেন, আমাদের দেশ সে অর্থে গরিব ছিল না। গরিবরা ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা থেকেই আমরা এতদূর এসেছি। আকাক্সক্ষার ডায়নামিক স্ট্যাটাস বোঝা জরুরি। দেশে এখন অনেক শিক্ষিত বেকার আছেন। তাদের আরও দক্ষ হয়ে কাজ করতে হবে।
