চেক নগদায়ন না হলে শেয়ার কেনা যাবে না পুরনো একটি নির্দেশনা নতুন করে জারির পর পতনবৃত্তে পড়েছে দেশের পুঁজিবাজার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির এমন নির্দেশনার পর টানা চার দিন ধরে মূল্যসূচকের পতন হচ্ছে, বেশিরভাগ শেয়ার ফিরে যাচ্ছে ফ্লোর প্রাইসে। বাজার মধ্যস্থতাকারীরা নির্দেশনাটি প্রত্যাহারের দাবি জানালেও কমিশন তা আমলে নেয়নি। এতে করে আগামীতে বাজার আবারও দীর্ঘ মন্দায় পড়তে পারে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এমন শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
‘চেক’ নির্দেশনাটি পর্যালোচনা করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ডেকে পাঠিয়েছিল কমিশন। তবে চেক দিয়ে লেনদেনে কিছু ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তা ও কারসাজিকারকদের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ থাকায় নির্দেশনাটি পর্যালোচনার বিষয়ে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এসইসি।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কারসাজিকারকদের একটি অংশ ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় চেক দিয়ে বিপুল পরিমাণের শেয়ার কিনছেন। পরবর্তীতে চেক ডিজঅনার হলে সামান্য কিছু জরিমানা দিয়ে শেয়ারের ম্যাচিউরড দিনে তা বিক্রি করে অনৈতিক মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ কর্তারাও ওই মুনাফার ভাগ পাচ্ছেন বলে কমিশনে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে আপাতত চেক বিষয়ে নির্দেশনাটি প্রত্যাহার করতে চাইছে না এসইসি।
এদিকে নির্দেশনাটি প্রত্যাহারে কমিশনের ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে কিছু ব্রোকারেজ হাউজ ও কারসাজিকারকরা মিলে বাজারে বিক্রিচাপ তৈরির মাধ্যমে সূচকের পতন ঘটাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ সংগঠন ডিবিএ থেকে চেকের নির্দেশনাটি প্রত্যাহারে চাপ দেওয়া হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মূলত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা, দেশে বিদ্যুৎ-জ¦ালানির সংকট, ডলার সংকট ইত্যাদি কারণে দেশে ভীতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে থাকা ভালো কৌশল বলে মনে করছেন। এ কারণে বিক্রিচাপ বেড়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপও বাজারে রয়েছে। যদিও বেশিরভাগ শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে থাকার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করতে পারছে না।
গতকালের পুঁজিবাজারের লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চেক নিয়ে ভীতি ও দেশীয় পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তার কারণে গতকালও দিনভর অস্থিরতা দেখা গেছে। বেশিরভাগ শেয়ারের পতনে সূচক কমলেও তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও দেখা গেছে। বেলা ১১টা ৩৭ মিনিটে ডিএসইর প্রধান সূচকটি আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৩৭ পয়েন্ট কমলেও এসইসির উদ্যোগে বেলা ১টায় সূচকটি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। তবে এরপর আবারও বিক্রিচাপ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত সূচকটি ১২ পয়েন্ট কমে দিনের লেনদেন শেষ করে।
তবে গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া বেশিরভাগ শেয়ারে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্রেতা ছিল না। এ কারণে অন্তত দুইশোর বেশি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ফ্লোর প্রাইসে রয়ে গেছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭৯টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ৪৯টির, কমেছে ১০০টির ও অপরিবর্তিত ছিল ২২০টির।
বেশিরভাগ খাতের বাজার মূলধন কমলেও বড় মূলধনী কোম্পানি ব্যাংক, সিমেন্ট এবং খাদ্য ও অনুষঙ্গ খাত সূচকের বড় পতন থেকে কিছুটা রক্ষা করেছে। গতকাল এসব খাতের বাজার মূলধন সামান্য বেড়েছে। এর সঙ্গে পাট এবং সেবা ও নির্মাণ খাতের বাজার মূলধনও বেড়েছে। এর বাইরে অন্যসব খাত দর হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে কাগজ ও প্রকাশনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। গতকাল এ দুই খাত প্রায় আড়াই শতাংশ করে বাজার মূলধন হারিয়েছে।
এদিকে সূচক কমে যাওয়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ৬ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড, যা আগের দিনের চেয়ে ২৯২ কোটি টাকা কম। সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেনের শীর্ষস্থানে থাকা ওরিয়ন ফার্মা, বেক্সিমকো লিমিটেডসহ সব কোম্পানির লেনদেনের পরিমাণ কমেছে।
