মাছের খামারে মুরগির বিষ্ঠার ব্যবহারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম

গাজীপুরের শ্রীপুরে সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় মাছের খামারে মাছের খাদ্য হিসেবে মুরগির বিষ্ঠার (পায়খানা) ব্যবহার আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষ্ঠা ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও কেউ তা মানছে না। দিন দিন অস্বাস্থ্যকর এ বিষাক্ত বিষ্ঠার ব্যবহার বেড়েই চলেছে কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায়।

জনমানুষ চলাচলের রাস্তার পাশে স্তূপ করে বিষ্ঠা রেখে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেরও সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে উৎকট দুর্গন্ধে মানুষ অতিষ্ঠ। বাতাসে অসহ্য উৎকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের মানুষজন নিরুপায় হয়ে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখেন। এতে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কোমলমতি শিশুরা রয়েছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। স্কুলে যাওয়ার পথে তাদের পড়তে হয় দুর্গন্ধের বিড়ম্বনায়।

এমন দৃশ্যমান অপরাধ চললেও এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আর এ সুযোগে গড়ে উঠছে বিষ্ঠার লাগামহীন রমরমা ব্যবসা। চলছে মাছের খামারে অবাধ ব্যবহার। এতে মাছের প্রকৃত স্বাদও নষ্ট হচ্ছে বলে জানান ক্রেতারা।

বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, মাছ বিষ্ঠা খাওয়ার ফলে মানুষের পেটে চলে যাচ্ছে মুরগিতে ব্যবহৃত বহু উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক। যার ফলে মানুষের শরীরে সৃষ্টি হচ্ছে ওষুধ রেজিস্ট্যান্স। এতে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে দিন দিন।

স্থানীয়রা জানায়, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন অঞ্চলের মুরগির খামার থেকে স্বল্পমূল্যে বিষ্ঠা কিনে মাছের খামারিদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। পরে সে বিষ্ঠাগুলো নিজেদের মাছের খামারে ব্যবহার করছেন খামারিরা। এতে একদিকে মানুষের মধ্যে রোগবালাই বাড়ছে। অন্যদিকে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে দিনের পর দিন। অনেক সময় দুর্গন্ধে রাস্তা দিয়ে চলাচল করাই দায় হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা মৎস্য অফিস কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না। এ সুযোগে বিষ্ঠার ব্যবহার বেড়েই চলেছে।

এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় পরিবেশ নষ্ট হয়ে মানুষের দুর্ভোগ চরমে। মৎস্য অফিস বলছে, এটা দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। আবার বিষ্ঠা ব্যবহারে মাছের উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাছের রোগবালাইও বেড়ে যাচ্ছে। শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ঘুরে চোখে পড়েছে এসব চিত্র।

লাকচতল গ্রামের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সাতখামাইর-কাওরাইদ সড়কের ভিটিপাড়া মোড় হয়ে কাওরাইদ যেতে এ সড়কের দুপাশে বেশ কিছু মাছের খামার গড়ে উঠেছে। এ সড়কে চলতে চোখে পড়ে মাছের খামারগুলোর জন্য আনা মুরগির বিষ্ঠাভর্তি বস্তার স্তূপ জমা করে রাখা। এসব স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে দিনের পর দিন। দু-এক দিন পরপর স্তূপ থেকে বিষ্ঠা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে খামারের পানিতে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাছচাষি বলেন, এক বছরে মাছের খাদ্যসহ যাবতীয় খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। নিরুপায় হয়েই আমরা মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করি। ভুলে মাত্রাতিরিক্ত বিষ্ঠা ছেড়ে দিলে পানিতে গ্যাস জমে মাছে মড়ক লাগে। পানির মান নষ্ট হয়। দুর্গন্ধ ছড়ায়। তবুও সবাই বিষ্ঠা ব্যবহার করে।

শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রোকনুজ্জামান পলাশ জানান, মুরগির রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। আর সেসব অ্যান্টিবায়োটিকের একটা অংশ লম্বা সময় মুরগির বিষ্ঠায় থেকে যায়। সেসব বিষ্ঠা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারে কোনো না কোনোভাবে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে। সালমোনেলা, ইকলাইয়ের মতো রোগ মুরগির বিষ্ঠায় দীর্ঘসময় থেকে যায়। যা মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

শ্রীপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ওয়াহিদুল আবরার বলেন, আমাদের মৎস্য আইনে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা নেই। তাই আমরা চাইলেই কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারি না।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে মৎস্য আইনে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় খুব বেশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত