রাজধানীর বাইরের বিভাগগুলোর সমাবেশ শেষে আগামী ১০ ডিসেম্বর শনিবার ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ। সমাবেশ থেকে সরকারের পদত্যাগ ও সংসদ বিলুপ্ত করার দাবিতে আলটিমেটাম দেওয়ার চিন্তা করছেন দলটির নেতারা। সমাবেশে বাধা দিলে সারা দেশ অচল করে দেওয়ার ভাবনাও রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা।
ঢাকার বিভাগীয় সমাবেশ সফল করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমানকে। গতকাল মঙ্গলবার নোমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার সমাবেশের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা। ২৫ অক্টোবর সমাবেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে সমাবেশ সফল করতে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। ঢাকার সমাবেশের আগে সবগুলো বিভাগীয় সমাবেশের অবস্থা পর্যালোচনা করে ঢাকার সমাবেশ করব আমরা।’
গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিএনপি ৯টি বিভাগে গণসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে। ঘোষণা অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে ও ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহে সমাবেশ করেছে দলটি। ২২ অক্টোবর খুলনা, ২৯ অক্টোবর রংপুর, ৫ নভেম্বর বরিশাল, ১২ নভেম্বর ফরিদপুর, ১৯ নভেম্বর সিলেট, ২৬ নভেম্বর কুমিল্লা, ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী এবং সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার কথা ভাবছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। ঢাকার সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হবে দ্বিতীয় ধাপের কর্মসূচি। এর আগে প্রথম ধাপে ২২ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী জেলা, উপজেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার সমাবেশ থেকে সরকারের পদত্যাগ ও সংসদ বিলুপ্ত করার জন্য সরকারকে আলটিমেটাম দেওয়ার কথা ভাবছি আমরা। এ ছাড়া ঢাকার সমাবেশে বাধা দিলে আমরা প্রয়োজনে ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কথা ভাবছি। ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহের সমাবেশের আগের দিন থেকে একধরনের পরিবহন সংকট ছিল। ময়মনসিংহ শহরে কোনো গণপরিবহন ছিল না। একধরনের অঘোষিত কারফিউয়ের মতো পরিস্থিতি সরকার সৃষ্টি করেছিল। ঢাকার সমাবেশের আগে সরকার অঘোষিত কারফিউ জারি করতে পারে। পরিবহন বন্ধ করে দিতে পারে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মিলে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করবেন। সমাবেশ থেকে সরকারকে কী বার্তা দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হবে।’
১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ থেকে কী সিদ্ধান্ত আসতে পারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার সমাবেশ হবে অন্যান্য বিভাগের সমাবেশ শেষে। এর আগে অন্যান্য সমাবেশে সরকার কী আচরণ করে তা আমরা পর্যবেক্ষণ করব। এরপর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভার্চুয়ালি স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠক হবে। বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হবে আমরা সমাবেশ থেকে সরকারকে কী বার্তা দেব। সময়ই বলে দেবে রাজনীতির গতিপথ কী হবে।’
এদিকে রাজধানীতে এক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান বলেছেন, ‘১০ ডিসেম্বর থেকে দেশ চলবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কথায়।’ পরে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলে অবস্থান থেকে সরে আসেন আমান। অন্যদিকে বিএনপির কোনো কোনো নেতা বলেছেন, ‘সমাবেশে যোগ দিতে পারেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব কথা আমি কিংবা আমাদের দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কোনো নেতা ঘোষণা করেননি। তাই এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। ওই দিন কী হবে, সে সিদ্ধান্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আমরা স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ভার্চুয়ালি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেব।’
সমাবেশের স্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে নোমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে নেতাকর্মীদের ঢল নেমেছে। রাজধানী ঢাকায় নেতাকর্মীদের ঢল বাড়বে। তাই সমাবেশস্থল নিয়ে চিন্তিত। কারণ রাজধানী ঢাকায় সমাবেশ করার মতো জায়গার বড় অভাব। আমাদের সমাবেশের জন্য মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ কিংবা পল্টন ময়দান যথার্থ হতো। আমরা প্রাথমিকভাবে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার কথা ভাবছি।’
ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ সফল করতে ২৫ অক্টোবর রাজধানীর ঢাকার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রস্তুতি সভা হবে। সভায় সমাবেশ সফল করতে বিস্তারিত আলোচনা করব। সমাবেশ সামনে রেখে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হতে পারে। ধরপাকড় করা হতে পারে। সব বিষয় মাথায় রেখেই কর্ম পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। প্রস্তুতি সভায় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ মহানগর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও রাজবাড়ী জেলাগুলোর বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, এসব জেলার সাবেক এমপি, মন্ত্রী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্যরা, ভাইস চেয়ারম্যানরা, নির্বাহী কমিটির সদস্যরা প্রস্তুতি সভায় অংশ নেবেন।’
তিনি বলেন, ‘ঢাকার সমাবেশ হবে স্মরণকালের সেরা সমাবেশ। সমাবেশে নেতাকর্মীদের ঢল নামবে। সমাবেশে সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের বাধা দিলে কিংবা হামলা হলে, তাৎক্ষণিক সারা দেশ অচল করে দেওয়া হতে পারে। সমাবেশ ঢাকায় হলেও সারা দেশে সব সাংগঠনিক ইউনিটের নেতাকর্মীরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুত থাকবে।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় বিশাল র্যালি করেছি আমরা। র্যালিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর অংশগ্রহণ ছিল। তবে রাজধানী ঢাকায় যে সমাবেশ আগামী ১০ ডিসেম্বর করতে যাচ্ছি, তা হবে স্মরণকালের সেরা সমাবেশ। সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে বিভাগীয় সমাবেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, রাজধানী ঢাকার সমাবেশের দিন কিংবা আগের দিন সরকার হস্তক্ষেপ করে পরিবহন ধর্মঘট ডাকতে পারে। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে পুলিশি চেকপোস্টের নামে হয়রানি হতে পারে। রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানায় থানায় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করতে পারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সব বিষয় মাথায় রেখে সমাবেশ সফল করার পরিকল্পনা করব আমরা। মহানগর বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দিয়েই সমাবেশস্থল ভর্তি করা হবে। ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে যে নেতাকর্মী আসবে তা বোনাস হবে।’
