সাইবার আক্রমণ থেকে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ ২৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। সাইবার-নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানকে সিআইআই (ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার) ঘোষণা করে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ সম্প্রতি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়,বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তালিকায় আরও আছে সেতু বিভাগ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, জাতীয় ডেটা সেন্টার ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড প্রভৃতি।
আইনের ১৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘আইনের বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কিনা সেটি নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনে সময় সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো পরিবীক্ষণ ও পরিদর্শন করবেন ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালক।’
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনিভাবে প্রবেশ করলে আইন লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে সাত বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পরিকাঠামোতে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে ক্ষতি করলে বা ক্ষতির চেষ্টা করলে ১৪ বছর কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কেউ যদি দ্বিতীয়বার বা তার বেশিবার একই অপরাধ করে তাহলে যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা অনধিক ৫ কোটি টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রয়েছে।
সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ২৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করায় সাংবাদিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকার বিঘি্নত হয়েছে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। এ প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে জনসেবা ও পরিষেবা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যত্যয় ঘটলে এ সংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তির কোনো সুযোগ থাকবে না, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি। এ প্রজ্ঞাপন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অনিয়ম ও জবাবদিহিহীনতাকে উৎসাহিত করবে। তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী, তথ্য পাওয়ার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হলেও ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করে জারি করা এ প্রজ্ঞাপনের বিশদ স্পষ্টীকরণ দরকার।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ইতোমধ্যে (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ) বাকস্বাধীনতা ও মুক্তিবুদ্ধির চর্চার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সাংবাদিক, আইনবিদ, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিকসমাজের প্রতিনিধি এবং সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে। আইনটির পরিবর্তন, পরিমার্জন, বিয়োজন ও সংযোজনের বিষয়ে নানা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সুপারিশও করা হয়েছে। আগেও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া প্রেস কাউন্সিল আইনের সংশোধনীর বিষয়ে সম্পাদক পরিষদ উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল।
জনস্বার্থ রক্ষা এবং সেবা নিশ্চিত করার জন্য তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করে জারি করা প্রজ্ঞাপন স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য নতুন চাপ ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রজ্ঞাপনটির অস্পষ্টতা দূর করে এটির স্পষ্টীকরণের জন্য সম্পাদক পরিষদ জোর দাবি জানাচ্ছে।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা থেকে এ দাবি জানানো হয়।
