আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে ধারাবাহিকভাবে কমছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বিলাসপণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধসহ নানা উদ্যোগের পরও আমদানি-রপ্তানিতে বড় ব্যবধান থাকায় গত ১৫ মাসের ব্যবধানে রিজার্ভ প্রায় ১৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার কমে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে আরও ৬ কোটি ডলার সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এসে ঠেকেছে ৩৫ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে। গতকাল বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে সব মিলিয়ে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট ডলার বিক্রি হয়েছিল ৭৬২ কোটি ১৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে গতকাল পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২১২ কোটি ডলার। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমে এখন ৩৫ বিলিয়নের ঘরে নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে ভাটা পড়ায় রিজার্ভে চাপ পড়ছে। ডলার সংকট প্রতিদিনই প্রকট আকার ধারণ করছে। ডলারের এ চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার ছাড়ছে। যদিও গত কয়েক মাসে ডলার সরবরাহ করেও চাপ সামাল দেওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৬৭ কোটি ২৭ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে এসেছিল ৫৪০ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। এর আগের ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্সে এসেছিল ৬৭১ কোটি ৩২ লাখ ডলার। করোনার মধ্যেও রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।
সম্প্রতি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় পাঠানোর হার কিছুটা কমেছে। রেমিট্যান্স ভাটায় দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। এদিকে দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আগামীতে দেশের অর্থনীতি আরও বড় সমস্যার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রিজার্ভ কমে যাওয়া প্রসঙ্গে গতকাল এক অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এটা দিয়ে আমদানি ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে? কারণ সামনের দিনে ডলার-সংকটে খাদ্য আমদানি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তিনি বলেন, ডলার বাজারের যে অবস্থা, সরকার কি খাদ্য আমদানি করবে নাকি অন্য খরচ মেটাবে, এটা নিয়ে সংশয় দেখা দিচ্ছে।
সিপিডি বলছে, আইএমএফের হিসাবে এটা প্রকৃত রিজার্ভ নয়। কারণ, এর থেকে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন ব্যয় বাবদ বাদ দিতে হবে। এ জন্য আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানে যে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে সেগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা দরকার।
বাংলাদেশে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ৩০০ কোটি ডলার বা ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে তা ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০০১-০২ অর্থবছর পর্যন্ত রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলারে (২০০ কোটি ডলার) ছুঁতে পারেনি। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বৈশ্বিক মন্দা হলে রিজার্ভ ৭ বিলিয়ন থেকে কমে ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। করোনার কারণে আমদানি কমে যাওয়া ও প্রবাসী আয়ে বড় উত্থান হলে গত বছর আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। এখন তা ৩৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিক্রি করা ডলারের জন্য পরিশোধ এবং একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংকে টাকারও সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
