গত ১৮ অক্টোবর ছিল বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। এখনো ভক্তের হৃদয়ে একইভাবে বিরাজমান এই তারকা। প্রিয় বন্ধুর প্রয়াণ দিবসে তাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্মরণ করেছেন চিরসবুজ গায়ক কুমার বিশ^জিৎ। এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি
একসঙ্গে শৈশব-কৈশোর...
মায়ের কাছে আমি আর বাচ্চু [আইয়ুব বাচ্চু] ছিলাম দুই ছেলে। তাই বন্ধু থেকে একে অপরের ভাই হয়ে উঠতেও সময় লাগেনি। চট্টগ্রামের জুবিলি রোডের পাশাপাশি দুটি বাসায় থাকতাম আমি আর বা”চ্চু। এ-বাড়ি ও-বাড়ি যাওয়া-আসা লেগেই থাকত। দুজনই ছিলাম গানপাগল। সারা দিনের ভাবনাজুড়ে থাকত গান আর গান। গানের টানে আমরা চট্টগ্রামের প্রায় সব জায়গা চষে বেড়িয়েছি। ছোট-বড় যেমনই গানের আয়োজন হোক, সেখানে আমাদের যাওয়া চাই-ই চাই। সে নেশা থেকেই ১৯৭৭ সাল থেকে একসঙ্গে ব্যান্ড গড়েছিলাম ‘ফিলিংস’।
রাজধানীর জীবন...
আশির দশকের মাঝামাঝি আমি যখন ঢাকায় চলে আসি, তখনো বাচ্চুর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। তারপরও জানতে পারিনি বাচ্চু নিজেও ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই হঠাৎ ঢাকায় এসে বাচ্চু আমাকে দারুণভাবে চমকে দিয়েছিল। এরপর ঢাকা শহরে থেকেই শুরু হয়েছিল সংগীত নিয়ে স্বপ্নবুনন। ঢাকায় এসে প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। হাল ছাড়িনি, কারণ দুজনেরই ব্রত যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি, সেখান থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনার। স্বপ্ন ছিল পৃথিবীজুড়ে বাংলা গান ছড়িয়ে দেওয়ার। সে লক্ষ্যেই একসঙ্গে চার দশকের পথ পাড়ি দিয়েছি আমরা। এই পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাসও কম ঘটনাবহুল নয়। সেসব লিখতে গেলে তা মহাকাব্যের মতোই বিশাল হয়ে যাবে।
স্মৃতির পাতা থেকে...
আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে বলার মতো কত কথা যে জমে আছে, কত স্মৃতি যে হৃদয় আন্দোলিত করে তার হিসাব দেওয়া কঠিন। এর পরও একটা ঘটনা বলি, যেটা ঘটেছিল আমার সংগীতজীবনের ২৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে। ওই অনুষ্ঠানের কথা শুনেই বাচ্চু একটা ইন্সট্রুমেন্টাল তৈরি করেছিল। শুধু তাই নয়, অনুষ্ঠানেও গিটার বাজিয়েছিল বাচ্চু। সেদিনই পরিকল্পনা করেছিলাম, আলাদা একটি আয়োজন করব যেখানে ও গিটার বাজাবে, আমি গাইব। কিন্তু আজ করব, কাল করব করতে করতে আর করাই হয়নি। এর মধ্যে কেটে গেছে অনেকটা সময়। দুজনেই যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। দেখা-সাক্ষাৎ কমে গেছে। তাই অভিমান করেই একদিন ফোন করে ওকে বলেছিলাম ‘তুই আমার বাসায় আসিস না কেন?’ এ প্রশ্ন শুনে ও হেসে বলেছিল ‘আসব দোস্ত। না এসে কি পারি, আমরা তো আমরাই। আমরা একজন মরলে তো আরেকজন কাঁধে নেব।’ ওর এই কথায় অভিমান চলে গিয়েছিল, কিন্তু এটা যে বাস্তব হবে তা বিশ্বাস করিনি। নিয়তির খেয়ালে ওর কথাই শেষ পর্যন্ত বাস্তব হয়ে গেল। কাঁধে নিতে হলো বন্ধুর লাশ। এ যে কত কষ্টের, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এ শুধু অনুভবের।
