আর্থিক কর্মসূচি নিয়ে তীব্র বিতর্ক-বিবাদের মধ্যে অর্থমন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এ নেতা। তবে বুধবার তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদত্যাগ করার পর তার সব হিসাব-নিকাশ বদলে যায়। বৃহস্পতিবার নিজেই পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। মাত্র ৪৫ দিন ক্ষমতায় ছিলেন রবিস জনসনের স্থলাভিষিক্ত লিজ ট্রাস।
বিবিসি জানাচ্ছে. লন্ডনের স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে জাতির উদ্দেশে ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কনজারভেটিভ পার্টির এ নেতা। সে সময় তিনি বলেন, যে ম্যানডেটের ভিত্তিতে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই ম্যানডেট তিনি পূরণ করতে অপারগ।
বিবিসি বলছে, লিজ যে আভাস দিয়েছেন তাতে আগামী শুক্রবার নতুন নেতা নির্বাচিত করতে পারে তার দল। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তিনিই প্রধানমন্ত্রীর পদ সামলাবেন। ইতিমধ্যে লিজ ট্রাস এরই মধ্যে রাজা চার্লসকে পার্টির নেতৃত্ব থেকেও সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিশৃঙ্খল রাজনীতির মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখ ক্ষমতা গ্রহণ করেন লিজ ট্রাস। তবে কনজারভেটিভ পার্টির এই নেতা কখনোই তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে পারেননি। বরং সার্বিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন তার নিজ দল কনজারভেটিভ পার্টির অন্তত ১৩ জন এমপি। আর্থিক কর্মসূচি নিয়ে তীব্র বিতর্ক-বিবাদে তার অর্থমন্ত্রী কাওয়াসি কোয়ার্টেং আগেই পদত্যাগ করেছেন। গতকাল পদত্যাগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রাভারম্যানও। তারপরই নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন ট্রাস।
বিবিসি বলছে, লিজ ট্রাসের সমস্যা শুরু হয় গত ২৩ সেপ্টেম্বর তার সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী কাওয়াসি কোয়ার্টেং সংক্ষিপ্ত বাজেট উপস্থাপন করার পর। ওই বাজেটে কর কমানোর ঘোষণা দিলে যুক্তরাজ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। কমে যায় ব্রিটিশ পাউন্ডের দাম। এরপর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে কাওয়াসি কোয়ার্টেংকে সরিয়ে দিয়েছিলেন লিজ ট্রাস। তবে তারপরেও তার পদত্যাগের দাবি তুলতে থাকেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা। এ নিয়ে শুরু হওয়া টানাপড়েনের মধ্যে দেশ সামলানোর গুরুদায়িত্ব হাতে তুলে নেওয়া লিজ ট্রাস মাত্র ছয় সপ্তাহ পরই হাল ছেড়ে দিলেন। ট্রাস বলেন, যে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কনজারভেটিভ পার্টি তাকে নির্বাচিত করেছিল তা তিনি দিতে পারেননি।
এদিকে বিবিসি এক বিশ্লেষণে বলেছে, লিজ ট্রাসের ঘোষিত অর্থনৈতিক কর্মসূচির ব্যর্থতা এবং তার নিজ দলের এমপির মধ্যে আস্থা ও সমর্থন হারানোর কারণেই পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময়ই লিজ ট্রাস বলেছিলেন, তিনি নিম্ন কর হার এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ব্রিটেন গড়ে তুলবেন। তার প্রথম অর্থমন্ত্রী কাওয়াসি কোয়ার্টেং যে মিনি বাজেট দেন তাতে ব্যাপক কর ছাঁটাইয়ের কথা ছিল কিন্তু এর জন্য অর্থসংস্থান করতে সরকারকে হাজার হাজার কোটি পাউন্ড ঋণ নিতে হতো। এ বাজেট ঘোষিত হওয়ার পরপরই তা অর্থ খাতে নজিরবিহীন সংকট সৃষ্টি করে এবং কোয়ার্টেং পদত্যাগ করেন। নতুন অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট এসে সেই পরিকল্পনার অধিকাংশই বাতিল করে নতুন পরিকল্পনা হাজির করেন। এর পর থেকেই এমপিদের আস্থা হারাতে থাকেন লিজ ট্রাস। এমপিরা প্রকাশ্যে তাদের অনাস্থা প্রকাশ করে পদত্যাগ দাবি করেন। লিজ ট্রাস প্রশাসন, দল এবং পার্লামেন্ট সর্বত্রই তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। গতকাল তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রাভারম্যানও পদত্যাগ করেন। পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি নিয়ে সরকারি দলের এমপিদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ থেকে প্রায় ধস্তাধস্তির উপক্রম হয়।
বিশ্লেষকরা বলছিলেন, এতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে লিজ ট্রাস ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।
এখন ট্রাসের পদত্যাগের ঘোষণায় নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন সে আলোচনাও শুরু হয়েছে। সাধারণত কনজারভেটিভ পার্টির ভেতরে এ নির্বাচনের প্রক্রিয়া কয়েক মাস ধরে চলে। প্রথম এমপিরা কয়েকজন প্রার্থীকে নির্বাচন করেন এবং তাদের মধ্যে যিনি পার্টি সদস্যদের ভোট সবচেয়ে বেশি পান তিনিই প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু এবার পুরো প্রক্রিয়াটি হয়তো এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করতে হবে। ‘১৯২২ কমিটি’ নামে এমপিদের বিশেষ কমিটির প্রধান স্যার গ্রাহাম ব্র্যাডি বলেছেন, আগামী শুক্রবারের মধ্যেই এ নির্বাচনের ফল জানা যাবে এবং তাতে পার্টি সদস্যরাও জড়িত থাকবেন।
বিবিসি বলছে, লিজ ট্রাস প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় যারা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন- তার মধ্যে অন্তত দুজন ঋষি সুনাক এবং পেনি মরড্যান্টের নাম শোনা যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। এ ছাড়া আছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেসের নাম। তবে আগের দফায় দলের নেতা হওয়ার দৌড়ে নামা অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। তবে চমক দেখিয়ে মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে পদত্যাগ করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামতে পারেন। তবে একটি জনমত জরিপে বলা হচ্ছে, সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় এক নম্বরে আছেন ঋষি সুনাক।
