২৩ অক্টোবর, আজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ১৮তম মৃত্যুদিবস। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাবি) শুরুতেই যারা পড়তে এসেছিলেন তারা নেহাতই প্রাণের তাগিদে এমনটি করেছিলেন। আর্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী জয়নুল আবেদিনের নামটিও সম্ভবত তাদের কাউকে কাউকে আকর্ষণ করেছে। চল্লিশের দশকের শুরু থেকেই তৎকালীন বাংলার মুসলমানদের কাছে বেশ পরিচিত ও প্রিয় নাম ছিল জয়নুল আবেদিন।
এদেশের কিছু তরুণের চারুকলায় ছিল যেমন তাদের আপন আগ্রহ, তেমনি এক্ষেত্রের পথিকৃৎ জয়নুল আবেদিনের কৌশলী উদ্যোগের কথাও মনে করতে হয়। তিনি এবং তার কলকাতার শিল্পীবন্ধু ও সহযোগীরা যখন ঢাকায় চারুকলা বিদ্যায়তন খোলার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন একই সঙ্গে উদ্যোগী ছিলেন আগ্রহী মেধাবী ছাত্র জোগাড়ে। শুরুতে ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজের জায়গা হয়েছিল পুরাতন ঢাকার জনসন রোডে অবস্থিত তৎকালীন ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুল ভবনের এক তলার পেছন দিকের দুটি কামরা ও বারান্দায়। এখানেই শ্রেণিকক্ষ, এখানেই ৭/৮ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর বসার জায়গা। সম্ভবত সে কারণেই প্রথম দিকের ছাত্রদের আউটডোরে কাজ করতে বেশি উৎসাহ দেওয়া হতো।
প্রারম্ভিক এই ভূমিকাটি আর্ট কলেজের প্রাথমিক পরিবেশ বোঝার চেষ্টা। অতি স্বল্প পরিসরের দু’কামরার আর্ট কলেজেই কেটেছে ঢাকার চারুকলা বিদ্যাপীঠের প্রথম চার বছর। ১৯৫২ সালের মাঝামাঝি কলেজটি জনসন রোড থেকে নতুন ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাগানসহ মাঝারি আকারের একটি দোতলা বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। প্রথম ব্যাচের আমিনুল ইসলাম ও তার সতীর্থরা এখান থেকেই ১৯৫৩ সালে তাদের ৫ বছরের চারুকলা পাঠক্রম শেষ করেন। তাদের মতো একইভাবে একই পরিসরে চারুশিল্প শিক্ষা গ্রহণ করে পরবর্তী আরও তিনটি ব্যাচ। ঢাকার চারুকলার দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রসংখ্যাও সম্ভবত প্রথম ব্যাচের মতোই ১৪/১৫ জন হবে। এই ব্যাচের অন্তত ৬ জনের নাম পরবর্তী সময়ে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল, এরা হলেন আবদুর রাজ্জাক, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন ও জুনাবুল ইসলাম। প্রথম পাঁচ জনই একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী, কাইয়ুম চৌধুরী ও মুর্তজা বশীর স্বাধীনতা পদকও পেয়েছিলেন।
আবদুর রাজ্জাকের জন্ম শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ১৯৩২ সালে। ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান মাধ্যমিক) পরীক্ষা পাসের সাল রাজ্জাকের ১৯৪৭, ইন্টারমিডিয়েট (আইএসসি) পাস করে (১৯৪৯) চারুকলা পড়তে এসেছিলেন। সরকারি আর্ট কলেজে তার ব্যাচের প্রায় সব পর্যায়ে এবং চূড়ান্ত পর্বে, পরীক্ষায় সেরা ফল অর্জন করেছিলেন আবদুর রাজ্জাক, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। রাজ্জাক ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে আইএসসি পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন। ইচ্ছা করলে প্রকৌশল বিদ্যায় সুযোগ পেতে পারতেন, ম্যাট্রিক পাস হলেই চারুকলায় ভর্তি হওয়া যেত, সেখানে তিনি আইএসসি পাস করে ভর্তি হয়েছেন। গ্রামীণ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের ছেলে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রকৌশল বা প্রযুক্তি বিদ্যায় না গিয়ে চারুকলা বেছে নিয়েছেন একান্ত ব্যক্তিগত ভালোলাগা থেকে। বড় ভাই সীমিত আয়ের সরকারি চাকুরে। পুরান ঢাকায় তার ছোট ভাড়া বাড়িতেই রাজ্জাকের থাকা-খাওয়া। বেশ অর্থকষ্টের মধ্যেই ঢাকায় তার ছাত্রজীবন কেটেছে, নিজস্ব আয় বলতে হয়তো মাঝে মধ্যে সামান্য কিছু হতে পারত। তার বাবা সাদর আলী আমিন ছিলেন ঢাকার সার্ভে স্কুলের পাস করা সার্ভেয়র। কিন্তু পেশা হিসেবে তা নেননি, বরং গ্রামে নিজের জমিজমা দেখেছেন, গৃহস্থালি করেছেন। রাজ্জাক ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট, সাংসারিক বা পারিবারিক দায়দায়িত্ব তেমন ছিল না। রাজ্জাক শুরু থেকেই কলেজে তার ক্লাসের সেরা ছাত্র, অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিনের খুব প্রিয়। চারুকলায় স্নাতক হয়ে আমেরিকায় ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পান ও কৃতিত্বের সঙ্গে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাপচিত্রে বিশেষজ্ঞতা লাভ করেন। পেইন্টিং ও ভাস্কর্যেও উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। বস্তুত রাজ্জাক এদেশের এবং সম্ভবত উপমহাদেশের শিল্পীদের মধ্যে প্রথম চারুকলার মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী। ১৯৫৭ সালে দেশে ফিরে সরাসরি আর্ট কলেজে যোগদান করেন এবং ২০০৫ সালে মৃত্যুকাল পর্যন্ত শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন। ঢাকার সরকারি চারুকলা মহাবিদ্যালয়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে ‘চারুকলা ইনস্টিটিউট’-এ রূপান্তর (১৯৮৩-৮৫) করার মূল দায়িত্ব পালন করেছিলেন রাজ্জাক। রাজ্জাক পেইন্টিং, ড্রইং, প্রিন্টমেকিং বা ছাপচিত্রে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, পাশাপাশি ভাস্কর্য শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রসারে পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছেন। শিল্পী নভেরা আহমেদের ভূমিকা ছিল এদেশে আধুনিক ভাস্কর্যকে পরিচয় করানোতে, অন্যদিকে রাজ্জাক ভাস্কর্য শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়ে গেছেন। সামাজিকভাবেও মাধ্যমটিকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে গেছেন। তিনি নিজেও সৃজনশীল ভাস্কর্য সৃষ্টি করেছেন, তবে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন গাজীপুরের চৌরাস্তায় স্থাপিত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ভাস্কর্য, তার ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ শীর্ষক বিশালাকার মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্যটির (১৯৭২) জন্য।
চিত্রকলা মাধ্যমে তিনি তার ছ’দশকের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাস্তবানুগ, আধা বিমূর্ত আঙ্গিক থেকে সম্পূর্ণ বিমূর্ত আঙ্গিকে রূপান্তরিত হয়েছেন। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় সতীর্থ রশীদ চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে রাত জেগে পোস্টার আঁকা, ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে গোলাগুলির পর রক্তাক্ত আবুল বরকতকে বহনকারী সতীর্থ মুর্তজা বশীরকে পরে রিকশায় করে পুরান ঢাকায় তার বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, এ ধরনের ঘটনায় যুক্ত থাকা ছাড়া পরবর্তী সময়ে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন বা সংগ্রামের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত হননি, কিন্তু তিনি আগাগোড়াই আধুনিক, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি মানসিকতাসমৃদ্ধ ছিলেন। তার শিল্পকর্মে কোনো রকম ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ আসেনি। এমনকি প্রতীকীভাবেও নয়। পরিণত জীবনে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা তার সৃজনকর্মের প্রেরণা ও বিষয় হয়েছে। রাজ্জাক বিশেষভাবে স্মরণীয় ঐতিহাসিক নগর ঢাকাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আঁকা তার চিত্রমালার জন্য।
রাজ্জাকের পারিবারিক শান্তি ছিল, কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র, চারুকলার অত্যন্ত মেধাবী স্নাতক, আরিফ আহমেদ তনু হঠাৎ অসময়ে মারা গেলে রাজ্জাকের প্রচ- রকম মানসিক কষ্ট হচ্ছিল। তার বড় ছেলে আসিফ আহমেদ অনু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে আইবিএ’র এমবিএ করে বর্তমানে ব্যবসায় উদ্যোক্তা, একমাত্র কন্যা রুমানা সুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারসহ প্রবাসী। শিল্পী ও শিক্ষক আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যু ২০০৫ সালে, প্রায় ৭৫ বছর বয়সে। যশোরে এক চিত্রাঙ্কন কর্মশালায় শিক্ষাদানকালে হার্ট অ্যাটাক হয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মারা যান। রাজ্জাক তার দীর্ঘ শিল্পী ও শিক্ষকতার জীবনে তার নিজের দেশকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘একুশে পদক’ পেয়েছেন (১৯৮৭)। তার প্রিয় চারুকলা অনুষদ বিভিন্নভাবে তাকে স্মরণ করে ও শ্রদ্ধা জানায়।
লেখক : অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, প্রবীণ শিক্ষাবিদ, নগর গবেষক ও শিল্প লেখক। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের ভ্রাতুষ্পুত্র।
