মাঝেমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুধ দিয়ে গোসলের খবর আসছে পত্রপত্রিকায়। এর কোনো কোনোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালও হচ্ছে। এই দুধ দিয়ে যারা গোসল করেছেন তাদের একটি বড় অংশ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মী এবং তারা নানা কারণে হতাশ। রাজনীতির পঙ্কিল ক্ষেত্র থেকে মুক্তি অর্জনই যেন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। অবস্থাদৃষ্টে বোঝাই যাচ্ছে এরা হয় কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন, নয় তো প্রত্যাশিত মাত্রায় সফলতা না পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত। আমাদের সংস্কৃতিতে দুধে গোসলের নানা পর্যায়ের চর্চা আছে। মূলত এর মাধ্যমে সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়াকে উদযাপন করা হয়। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’, মধ্যযুগের কবি ভারতচন্ত্র রায় গুণাকরের এই বিখ্যাত উক্তি আমাদের দেশের সব বাবা-মা ই কামনা করে থাকেন। আবার টিপ্পনী কাটতেও আমরাই ব্যবহার করে থাকি যেন ‘দুধে ধোয়া তুলসী পাতা’। দুধের ব্যবহারের মাধ্যমে পবিত্র হওয়ার বিষয়টি অত সহজ নয় অধিকন্তু কঠিনই বটে।
সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী সরকারি দলের সদস্য ছিলেন কিন্তু নতুন কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া এমন একজন দুধে গোসল করে রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। আবার এমনও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে বিয়েবিচ্ছেদের পর দুধ দিয়ে গোসল করেছেন একজন। এ যেন মুক্তির আস্বাদ এবং পরিবারের সদস্যরাও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আবার কেউ কেউ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর দুধ দিয়ে গোসল করেছেন। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর নিজের কিশোর সন্তানকে দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে ঘরে তুলেছেন পিতা। শুধু তাই নয় পরীক্ষা শেষ করতে পারায় দুধে গোসল করে উদযাপন করেছেন শিক্ষার্থী। বোঝাই যায় দুধে গোসলের প্রক্ষিত ও চর্চা আমাদের দেশে অনেক বৈচিত্র্যময়। শোনা যায় মিসরের রানী ক্লিওপেট্রা গাধার দুধে গোসল করতেন এবং রানীর গোসলের জন্য সাতশত গাধা থেকে দুধ সংগ্রহ করা হতো। প্রচলিত ধারণা মতে গাধার দুধ ত্বকের জন্য উপকার।
প্রশ্ন হচ্ছে যারা রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন, তারা হঠাৎ কেন দুধে গোসল করে রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে চাচ্ছেন। এর দুই ধরনের ব্যাখ্যা থাকতে পারে। হতে পারে প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা। আবার হতে পারে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠে, সব রকমের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে, দেশ ও দশের মঙ্গলের জন্য আত্মনিয়োগ করা। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসবের কোনোটিই থাকে না, যা থাকে তা হচ্ছে ব্যক্তিগত প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া গল্প। আর এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, তাহলে রাজনীতির উদ্দেশ্য কী? কেনই বা তারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এবং এখন কেনই বা আবার ঘটা করে দুধে গোসল করে অবসর নিতে চাচ্ছেন। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে ব্যবধানটা কোথায়? সম্ভবত গলদটা এখানেই যে, এদের অনেকেই রাজনীতিতে এসেছেন ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায়। রাজনীতিতে ব্যক্তিগত পদ পদবির আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা থাকতেই পারে। কিন্তু রাজনীতিতে সমাজের সার্বিক মঙ্গল ও পরিবর্তনের বিষয়টি যদি বিবেচনায় না থাকে তাহলে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির সাপেক্ষে দ্রুত হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিশ্লেষকরা বলে থাকেন বাংলাদেশে আদর্শভিত্তিক রাজনীতির ধারা ক্রমক্ষয়িষ্ণু। রাজনীতিতে টাকা ও পেশিশক্তির প্রয়োগই এখন চূড়ান্ত নিয়ামক। যার যত টাকা আছে, তার পেশিশক্তির প্রভাব তত বেশি এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণও এদের হাতে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক কর্মীরা যেনতেন উপায়ে পদ-পদবি অর্জন ও তা ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের মোহে আচ্ছন্ন থাকেন। যারা যখন দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকেন তাদের যেমন এই সুযোগ সবচেয়ে বেশি আবার যারা থাকেন না তাদের অনেকেই এই একই স্বপ্নে বিভোর থাকেন।
আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখে থাকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমিটি, পাল্টা কমিটি গঠনের খবর। কমিটি হলেই একটি বিরোধী পক্ষ রাজপথসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি দিয়ে থাকে। বঞ্চিত অনেকেই দলের প্রতি তাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার সূত্র ধরে স্বীকৃতি ও প্রাপ্তির প্রত্যাশা করবেন সেটাও অস্বাভাবিক নয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রবণতাটা এ রকম যে, নেতা হওয়ার জন্য জনগণের সংশ্লিষ্টতা যতটা দরকার তার থেকে বেশি দরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদ পদবি। এ যেন নেতৃত্ব অর্জনের সংক্ষিপ্ত রাস্তা এবং এখান থেকেই অন্য সবকিছু অর্জনের চেষ্টা। আবার অনেকেই কমিটি গঠনে টাকার লেনদেনের কথা বলে থাকেন তা সত্যি হোক বা না হোক অন্তত এই ধরনের ধারণা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আছে। টাকা যে রাজনীতিতে এখন কত বড় ভূমিকা পালন করে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে জেলা পরিষদ নির্বাচন। নির্বাচনে টাকার লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রার্থী ও ভোটাররা এখন আরও বেশি খোলামেলা। ভোটারদের অর্থের বিনিময়ে খুশি করা এখন যেন এক সাধারণ রীতি। আবার ভোটের পর ভোট না পাওয়ার অভিযোগে টাকা ফেরত নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে এবং তা মিডিয়াতেও এসেছে। বলা বাহুল্য, ভোটের জন্য যারা অর্থের লেনদেন করেছেন তারা জনপ্রতিনিধিও বটে!
এবার আবার আসা যাক দুধে গোসল প্রসঙ্গে। দুধে গোসলের উদ্দেশ্য যদি পরিশুদ্ধ হওয়া হয় তাহলে তো জনগণ বা সমাজের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার নতুন উদ্যম তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা সেটা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর উদ্দেশ্য যদি হয় পদ-পদবি না পাওয়ার ব্যর্থতার গ্লানি মোচন তাহলে পরিতাপের কিছুই নেই, যা আছে তা হচ্ছে কীভাবে নতুন উদ্যমে জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করা যায় তার পথনির্দেশিক। বাংলায় ‘দুধের মাছি’র সমার্থক হচ্ছে সুসময়ের বন্ধু। রাজনীতিতে সুসময়ের সুবিধা যারা খোজেন তারা খুব সহজেই হতাশ হবেনসেটাই স্বাভাবিক।
আমরা চাই বা না চাই, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক রীতি ও পদ্ধতিতেও রূপান্তর ঘটেছে। আর নতুন এই চর্চায় অর্থের দাপট যেমন বেড়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসাব। আর এসবের হাত ধরেই রাজনীতিতে সহিংসতা ও রক্তপাত যেন এক সাধারণ ও নিয়মিত ঘটনা এখন। তাই দুধ দিয়ে গোসল আপাতদৃষ্টিতে রাজনীতিতে যে কোনো পরিবর্তন আনছে না তা বলাই বাহুল্য। সর্বশেষ, দুধ নিয়ে চাণক্যের একটি উক্তি দিয়ে আজকের আলোচনা শেষ করা যাক, তিনি বলেছেন, ‘আড়ালে কাজের বিঘ্ন ঘটায়, কিন্তু সামনে ভালো কথা বলে, ওপরে দুধ আর ভেতরে বিষ কলসির মতো, তাকে পরিত্যাগ করা উচিত।’
লেখক : কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী
