মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীর উদগ্র বাসনার বলি বিশ্ব

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২২, ১০:৪৩ পিএম

দীর্ঘ সাড়ে সাত মাস ধরে যুদ্ধ চলছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে বেড়েছে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির দাম। খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক উন্নত দেশেও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। গোটা বিশ্বে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, বেলজিয়াম, চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি, প্রভৃতি দেশে বিক্ষোভের ঘটনা বাড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির প্রধান তিন সূচকই এখন নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে। ১৩ মাস পর রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিতে লেগেছে হোঁচট। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর এই দুই সূচকে নেতিবাচক ধারার কারণে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমেছে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।

যে যুদ্ধ গোটা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে নাস্তানাবুদ করছে, তীব্র অর্থনৈতিক সংকটকে অনিবার্য করে তুলছে, সেই যুদ্ধের পেছনে আসলে কার স্বার্থ কাজ করছে? কারা এই যুদ্ধের উসকানিদাতা? কারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে? শুধুই কি ইউক্রেনের ন্যাটো জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহের কারণে রাশিয়া নিজের ‘নিরাপত্তার স্বার্থে’ দেশটিতে অভিযান পরিচালনা করেছে? নাকি রয়েছে ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ? অস্ত্র উৎপাদনকারীদের অস্ত্র ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই কি এই সর্বনাশা যুদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে প্রচলিত মত ও প্রপাগাণ্ডার বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। ইউক্রেন-রাশিয়া বর্তমান সংঘাতের পেছনে রয়েছে কয়েকজন প্রভাবশালী ধনাঢ্য ব্যক্তির ‘টাকার খেলা।’ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপের পর থেকে ইতিহাসে বিভিন্ন পতন-অভ্যুদয়ের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বসলেও কয়েকজন ব্যক্তির ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয়টিই সামনে চলে আসে। কারণ, কোনও দেশ যদি কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির (আদতে কিছু ব্যবসায়ী যারা রাজনীতি ও প্রশাসন উভয় নীতিনির্ধারকদের নিয়ন্ত্রণ করেন) হাতে গিয়ে পড়ে, তবে সেই দেশটি সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগতে শুরু করে। তার মধ্যে বিভ্রান্তি, বিক্ষিপ্ত ও পরস্পরবিরোধী ভাবনার বহিঃপ্রকাশ দেখা দেয়। জাতিগতভাবে ইউক্রেনীয়দের মধ্যে এবং অংশত রাশিয়াতেও এই অবস্থা দেখা দিয়েছিল। আর তা থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে এক টানাপড়েনও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

তবে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর স্বার্থের বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য আরও পেছনে ফিরে যেতে হবে। কাহিনীর সূত্রপাত ২০০৬ সালের একটি বৈঠকে, যেখানে ইউক্রেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইউশেঙ্কো তার প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য কয়েকজন মন্ত্রী এবং দিমিত্রি ফিরতাশ নামে এক প্রভাবশালীর সঙ্গে মিলিত হন। ফিরতাশ সেই সময় দেশের চেম্বার অব কমার্সের প্রধান ছিলেন। সম্প্রতি ফিরতাশ ‘ফিনান্সিয়াল টাইমস’-কে জানিয়েছেন, সেই বৈঠকে পশ্চিমপন্থি ইউশেঙ্কো বলেছিলেন, রাশিয়ার ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে বাধা দেওয়ার আগেই ইউক্রেনের তরফে ‘ন্যাটো’-তে যোগ দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। ওদিকে আবার রাশিয়াপন্থি প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ভিন্ন মত ব্যক্ত করে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং ক্রুদ্ধ হয়ে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান। তুর্কমেনিস্তান থেকে ইউক্রেনে গ্যাস নিয়ে এসে বিক্রি করাই ছিল ফিরতাশের প্রধান ব্যবসা। এই কাজে তিনি রাশিয়ার অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থা ‘গ্যাজপ্রোম’-এর পাইপলাইন ব্যবহার করতেন। গ্যাজপ্রোম বহুজাতিক সংস্থা হলেও তার মালিকানার সিংহভাগ ছিল রুশ সরকারের হাতে। ইয়ানুকোভিচের পরে প্রধানমন্ত্রিত্ব ইউলিয়া টিমোশেঙ্কোর হাতে যাওয়ার পর তিনি ফিরতাশের গ্যাস ব্যবসার ইতি ঘটিয়ে ভøাদিমির পুতিন এবং গ্যাজপ্রোমের সঙ্গে এক প্রত্যক্ষ বন্দোবস্তে আসেন। এর ফল দাঁড়ায় ভয়াবহ। ইউক্রেনে জ্বালানি গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে। টিমোশেঙ্কো পশ্চিম ইউরোপে ২০০৪ সালে ইউক্রেনে সংঘটিত ‘অরেঞ্জ রেভোলিউশন’-এর ‘নায়িকা’ নামে পরিচিত ছিলেন। সেই ‘বিপ্লব’-এ রাশিয়াপন্থি প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাচ্যুত হন। ইউক্রেনের অভ্যন্তরে টিমোশেঙ্কো পরিচিত ছিলেন ‘গ্যাস প্রিন্সেস’ নামে। পুতিনের মতো এক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তিনি বোঝাপড়ায় আসতে সমর্থ হয়েছিলেন, এটিই ছিল তার খ্যাতির প্রধান কারণ। দুই পরস্পর-বিরোধী শিবিরকে নিয়ে তিনি খেলতে জানতেন, খেলায় জয়ী হতেও জানতেন। কেবল ফিরতাশের সঙ্গে তার সম্পর্ক ব্যাপক শত্রুতায় পর্যবসিত হয়।

২০১০ সালে ‘গ্যাস প্রিন্সেস’ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হন। ফিরতাশ তার প্রতিপক্ষের দিকে আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এই প্রতিপক্ষকে হারিয়েই এক সময়ে টিমোশেঙ্কো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। ‘ফিনান্সিয়াল টাইমস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিরতাশ জানান, ইয়ানুকোভিচের প্রতি তার সমর্থনের পেছনে রাশিয়া-প্রীতি বা রাশিয়া-বিরোধিতা খুঁজতে চাওয়া ভুল হবে। টিমোশেঙ্কোর সঙ্গে বোঝাপড়াই তার আসল উদ্দেশ্য ছিল। গ্যাস চুক্তির কারণে টিমোশেঙ্কোর কারাদণ্ড হয়। দেশের ভেতরে এবং দেশের বাইরে অনেকেই ঘটনাটিকে রাজনৈতিক আলোকে দেখেছিলেন।

ইউক্রেনের অসংখ্য প্রভাবশালী পুঁজিপতির মধ্যে ফিরতাশ একটি উদাহরণ মাত্র। তার থেকে অনেক বড় মাপের খেলোয়াড় হলেন রিন্যাট আখমেটভ। যিনি কার্যত দনবাসের শাসনভার পরিচালনা করেন। দনবাস ইউক্রেনের ভারী শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। পুতিনের নজর অনেক দিন ধরেই দনবাসের দিকে। এই দুই পুঁজিপতি ইয়ানুকোভিচের দলের অর্ধেক পার্লামেন্ট সদস্যদের এবং সেইসঙ্গে মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টিকেও নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন বলে শোনা যায়। তাদের দু’জনেরই আর্থিক উন্নতি ঘটে উল্লেখযোগ্যভাবে। জার্মানির সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘স্পিগেল’ তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে ‘যৌথ বাণিজ্যোদ্যোগ’ বলে বর্ণনা করে। অত্যন্ত ধুরন্ধর খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মাইডান বিপ্লবের (‘রেভোলিউশন অব ডিগনিটি’ হিসেবেও পরিচিত) প্রাক্কালে তারা তাদের রাজনৈতিক ঘুঁটি সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফিরতাশ ‘গ্যাস প্রিন্সেস’-এর ক্ষমতায় ফেরার ভয়ে তটস্থ ছিলেন। ঘটনার গতি বদলালে ইয়ানুকোভিচকে পালিয়ে গিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নিতে হয়। ক্রুদ্ধ পুতিন ক্রিমিয়া দখল করেন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের দনবাসে ফিরিয়ে আনেন।

এই সময় রঙ্গমঞ্চে তৃতীয় প্রভাবশালীর প্রবেশ ঘটে। ইগর কোলোমোইস্কি। ১৯৯০-এর দশকে হেনাডিই বোহোল্যুবভ নামের এক চতুর্থ প্রভাবশালীর সঙ্গে তিনি গাঁটছড়া বেঁধে ব্যাংকিং ব্যবসায় নেমেছিলেন। তাদের ব্যাংকটিই পরে ইউক্রেনের বৃহত্তম ব্যাংকে পরিণত হয়। ঘটনা পরম্পরায় কোলোমোইস্কি নতুন প্রেসিডেন্ট পেট্রো পোরোশেঙ্কোর বিষনজরে পড়ে যান। পোরোশেঙ্কো নিজেও একজন বিলিয়নিয়ার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি আবার ‘চকোলেট কিং’ নামে পরিচিত ছিলেন। কোলোমোইস্কি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। টাকা মেরে দেওয়ার কারণে তার ব্যাংকের ২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্তকরণ ঘটে।

কিন্তু ২০১৯ নাগাদ যখন নির্বাচনের সময় উপস্থিত, কোলোমোইস্কি ফিরে আসেন এবং আবার রাজনীতির খেলায় যোগ দেন। তার টেলিভিশন চ্যানেল পোরোশেঙ্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী, পেশায় কৌতুকশিল্পী ভলোাদিমির জেলেনস্কির হয়ে প্রচার শুরু করে। জেলেনস্কি ওই মুহূর্তে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন সংবাদ শিরোনামে। দুর্নীতি দূরীকরণকে হাতিয়ার করে জেলেনস্কি তার নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন এবং বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। ২০২১-এ ‘প্যান্ডোরা পেপারস’ থেকে জানা গিয়েছিল প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং তার অন্তরঙ্গ বেশ কিছু ব্যক্তি সাগরপাড়ের বেশ কিছু বাণিজ্য সংস্থার নেটওয়ার্ক থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত। দ্বিতীয়ত, জেলেনস্কি তার প্রাক্তন পৃষ্ঠপোষকের থেকে নেকনজর সরিয়ে নেন এবং দু’মাস আগে তার নাগরিকত্ব বাতিল করেন।

উল্লিখিত কাহিনীতে বোঝা যায় কারা ইউক্রেনে ক্ষমতা নিয়ে খেলছেন। কিয়েভে তারা বিপুল সম্পদ জমিয়েছেন, একইসঙ্গে গণমাধ্যম সাম্রাজ্যকে ব্যবহার করে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। কার মনোনীত লোক মন্ত্রিত্ব পাবে, তারাই ঠিক করে দিচ্ছেন, কারা কেমন দামে গ্যাস সরবরাহ করবে সেটাও তারাই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। কোন রাজনৈতিক দল মাথাচাড়া দেবে এবং ক্ষমতা কায়েম করবে আর কোন দল পুতিনের থাবার নিচে বশংবদ হয়ে থাকবে, সে সবও তারাই ঠিক করে দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে, যুদ্ধের আগে ইউক্রেনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) তার ১৫ বছর আগেকার অবস্থান থেকে একচুলও নড়েনি। এই সব প্রভাবশালী ধনিকরা যখন টানাপড়েনের খেলায় মত্ত থেকেছেন, তাদের দেশ ইউরোপের একদা-সোভিয়েত থেকে বেরিয়ে আসা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দরিদ্রতম হয়ে থেকে গিয়েছে। এই মুহূর্তে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী। ইউক্রেনের ওপর এখন সীমাহীন অনিশ্চয়তার অন্ধকার, যেখানে যে কোনো মুহূর্তে ঝলসে উঠতে পারে পারমাণবিক অস্ত্রের বিধ্বংসী আলো।

মুষ্টিমেয় কয়েকজন পুঁজিপতির ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে কঠিন মূল্য গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের অস্ত্র ব্যবসা ও রাশিয়াকে দুর্বল করে রাখার স্বার্থ, রাশিয়ার রয়েছে বিশ্বমোড়ল হওয়ার ও ক্ষমতা সংহতকরণের স্বার্থ, এমনকি এশিয়ার ছোট্ট দেশ ইরানের রয়েছে রাশিয়ার মিত্র হয়ে অস্ত্র বিক্রি ও প্রভাব বিস্তারের স্বার্থ। স্বার্থের খেলায় মত্ত সবাই, কেবল বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের স্বার্থটাই দেখার কেউ নেই!

লেখক: লেখক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত