বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাদ্য সংকট নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে শুরু করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প কারখানার উৎপাদন অস্বাভাবিক হারে কমে যাচ্ছে, যার প্রভাব পুঁজিবাজারে বেশ কিছুদিন ধরেই রয়েছে। এমন বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ করেই শেয়ার ক্রয়ে চেক নগদায়ন বিষয়ক এক যুগ আগের একটি নির্দেশনা পুনরায় জারির কারণে পুঁজিবাজারে ভীতি ছড়িয়েছে। এর প্রভাবে টানা দরপতন দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে ফিরে যাচ্ছেন।
টানা পতন থেকে লোকসান কমাতে প্রায় সব শ্রেণির বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে নিরাপদে থাকতে চাইছেন। তবে চাইলেও শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না তারা। তালিকাভুক্ত দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সিকিউরিটিজ ফ্লোর প্রাইসে থাকায় শেয়ারগুলোতে লেনদেন প্রায় হচ্ছে না বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে ক্রেতার অভাবে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই ফ্লোর প্রাইসে ফিরে এসেছে। টানা দরপতনে ধারায় গতকাল নতুন করে আরও ৩৪টি শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে ফিরে এসেছে। এতে করে ফ্লোর প্রাইসে নেমে আসা শেয়ার সংখ্যা ২৭৯টিতে উন্নীত হয়েছে, যা তালিকাভুক্ত মোট শেয়ারের প্রায় ৭২ শতাংশ।
জ¦ালানি-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত প্রায় এক মাস ধরেই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এর মধ্যে গত ১১ অক্টোবর এসইসির নির্দেশে ডিএসই কর্তৃপক্ষ ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে নির্দেশনা দেয় যে, চেক নগদায়নের আগে তা দিয়ে শেয়ার ক্রয় করা যাবে না। এমন নির্দেশনার পর থেকেই মূলত পুঁজিবাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে ফিরে যাওয়া শুরু করেন। এতে করে শেয়ার বিক্রির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ফ্লোর প্রাইসে ফিরে যাওয়া কোম্পানির সংখ্যা বাড়তে থাকে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ১১ অক্টোবর ফ্লোর প্রাইসে থাকা কোম্পানির সংখ্যা ছিল ২২৮টি, যা গতকাল ২৭৯টিতে উন্নীত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ফ্লোর প্রাইসে থাকা কোম্পানির সংখ্যা ছিল ২৪৫টি। এ হিসাবে রবিবার ফ্লোর প্রাইসে নেমে এসেছে আরও ৩৪ শেয়ার। এর বাইরে ৫২টি শেয়ারের দর ফ্লোর প্রাইসের তুলনায় শূন্য দশমিক ১ থেকে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে আছে। ৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ১০ শতাংশের বেশিতে কেনাবেচা হচ্ছে না, এমন শেয়ার ১২টি। ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দরে কেনাবেচা হচ্ছে ৩৫টি শেয়ার। ফ্লোর প্রাইসের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে ৯টি কোম্পানির শেয়ার, এর মধ্যে ৭৫০ শতাংশ বেড়েছে ওরিয়ন ইনফিউশন।
এদিকে অধিকাংশ শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে নেমে আসার পরও সর্বশেষ সাত কার্যদিবসে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক ১৫৬ পয়েন্ট হারিয়েছে। সূচক পতনের হার প্রায় আড়াই শতাংশ। সূচক পতনের কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যেসব শেয়ারের দরবৃদ্ধির ওপর ভর করে সূচক বেড়েছিল, এসইসির চেক বিষয়ে নির্দেশনার পর এখন সেসব শেয়ারের দরও কমতে শুরু করেছে। গতকাল ডিএসইএক্স সূচক ৪৮ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৩৪৪ পয়েন্টে নেমেছে। এক্ষেত্রে বেক্সিমকো লিমিটেড, ওরিয়ন ফার্মা, জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, কহিনুর কেমিক্যালের কারণে সূচক হারিয়েছে ২২ পয়েন্ট।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহে বিডিকম অনলাইনের শেয়ার ৩৩ শতাংশ দর হারিয়েছে। এ ছাড়া ফারইস্ট নিটিং, বিবিএস ২৪ শতাংশ ও আজিজ পাইপস দর হারিয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ করে। ইস্টার্ন হাউজিং, বিডি ল্যাম্পস, পেনিনসুলা, ইনডেক্স অ্যাগ্রোসহ আরও বেশকিছু শেয়ার ২০ শতাংশের ওপর দর হারিয়েছে।
গত দুই কার্যদিবসে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারে। এসইসির নির্দেশনায় মূলধন বাড়ানোর বাধ্যবাধকতায় সাম্প্রতিক সময়ে এসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে আগ্রহ দেখা দেয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। কয়েকটি কোম্পানি মূলধন বাড়ানোর অংশ হিসেবে বোনাস লভ্যাংশও ঘোষণা করে। এতে করে স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর বাড়তে থাকে। যেসব শেয়ারের দর ফ্লোর প্রাইসের উপরে ছিল, তারমধ্যে স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলো শীর্ষে ছিল। এখন টানা পতনে ভীতি ছড়িয়ে পড়ায় এসব শেয়ারই সবচেয়ে বেশি দর হারাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে লেনদেনের পরিমাণেও টান লেগেছে। গতকাল ডিএসইতে ৭৮৮ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যা গত বৃহস্পতিবারের তুলনায় ১৮৭ কোটি টাকা বা ১৯ শতাংশ কম। তবে দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় এ লেনদেন প্রায় অর্ধেক।
গতকাল ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৮৮ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৫৯টির কেনাবেচা হয়েছে। অর্থাৎ ২৯ শেয়ারের কোনো লেনদেনই হয়নি। বাকিগুলোর মধ্যে মাত্র ১৭টির দর বেড়েছে, কমেছে ১১৯টির এবং অপরিবর্তিত ২২৩টির দর।
