‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এমন একটি প্রতিষ্ঠান কেউ আইন দেখুক বা না দেখুক বা যাই বলুক না কেন আমার অভিমত হলোএখানে প্রকৃত পক্ষে একজন ব্যক্তি অর্থাৎ চেয়ারম্যান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি কীভাবে কাজ করতে চান, কর্ম পরিধি কী হবে, কীভাবে নেতৃত্ব দেবেন সেটি সবচেয়ে জরুরি। কেননা তার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে কমিশন সফল হবে কি না, কাজ দৃশ্যমান হবে কি না। সোজা কথায় যদি বলি, এখানে যদি মেরুদ-হীন বা মাজাভাঙা মানুষকে দেওয়া হয় তাহলে কখনোই কাজ হবে না। যাকে এখানে নেতৃত্বে দেওয়া হবে তাকে মানবাধিকার কী সেটি ভালোভাবে বুঝতে হবে। এটিকে ধারণ করতে হবে। এই সম্পর্কে তার জ্ঞান থাকতে হবে। মানবাধিকার নিয়ে ভেতর থেকে উপলব্ধি থাকতে হবে। আমাকে কে কী বলল, সমালোচনা করল, কে অসন্তুষ্ট আর বিরাগভাজন হলো এসব নিয়ে চিন্তা করলে কমিশন তার কাজ করতে পারবে না।
‘কমিশনের কার্যক্রম কেন দৃশ্যমান হয় না এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রথম কারণ হলো এখানে নেতৃত্ব যেরকম হওয়া উচিত ছিল সেরকম হয়নি। আমি প্রায় ৬ বছর দায়িত্ব পালন শেষে বিদায়ের সময় বেশ উঁচু মানের একটি স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে এসেছিলাম। কেন কমিশন সেই উচ্চতায় পৌঁছেনি সেটি বোধগম্য নয়। তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। এখনো ‘বি’ স্ট্যাটাস নিয়ে চলতে হচ্ছে। এর চেয়ে উন্নতি করতে হলে আইন পরিবর্তন করতে হবে। কেননা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনের সীমাবদ্ধতা ও বাধা আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করা যায় না। পুলিশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে। কিন্তু তদন্ত করা যায় না। আইনের এই বড় বাধাগুলো অপসৃত হওয়া উচিত এবং এটা সরকারই করতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে আমাদের বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, এখানে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পেয়েছে। সরকার যেভাবে চাইবে সেভাবে ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। এই ধারণা পরিবর্তন করতে হবে এবং কমিশনে অধিক হারে নাগরিক-সমাজের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে, যারা মানবাধিকার বিষয়ে ধারণা রাখে।
‘১৯৯৯ সালের প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী জাতিসংঘের সহযোগী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থাকবে। সেটি স্বাধীন, বিস্তৃত কর্মপরিধির এবং সেটির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকতে হবে। এর প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের কমিশনের ঘাটতি রয়েছে। যদি সরাসরি বাজেট দেওয়া হতো তাহলেও বলতে পারতাম যে, কিছুটা স্বাধীনতা রয়েছে। শুধু বেতনভাতা, ভাড়া নিয়েই যদি সন্তুষ্ট থাকিতাহলে তো আর কিছু করার থাকে না। তাহলে টাকা খরচ না হলে ফেরত যাবেই।
বিচার-বহির্ভূত হত্যা অতীতেও ছিল। এই বিষয়টা ছিল কমিশনের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। তখনো সরকার বা রাষ্ট্রের ভাষ্য ছিল, দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যা হয় না। কিন্তু তাই বলে তো সত্যটা আড়াল করা যায় না। দেখতে হবে যত অভিযোগ আসছে সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডবিষয়ক কি না। পৃথিবীর অনেক দেশেই মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধরা হচ্ছে, বিচার ও শাস্তি হচ্ছে; কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় না বললেই চলে। এখন কীভাবে এই জাতীয় ঘটনার বিশ্লেষণ হবে, বিচার হবে সেই কাজটা কমিশনকেই করতে হবে। মানুষকে প্রতিকার দিতে হবে। তাহলেই কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছাতে পারব।’
সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
