ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। মাত্র সাত সপ্তাহ আগে লিজ ট্রাসের কাছে হারের পর এবার তিনি জয়ী হলেন। আর এর মাধ্যমে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এ রাজনীতিক গড়লেন নতুন ইতিহাস। দেশটিতে প্রথমবারের মতো একজন ব্রিটিশ-এশিয়ান রাজনীতিক প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। দলের পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনকারী এমপি কমিটির প্রধান স্যার গ্রেম ব্রেডি নিশ্চিত করেছেন যে ঋষি সুনাকই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
বিবিসি বলছে, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পর পেনি মর্ডান্টও কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বের সম্ভাব্য লড়াই থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলটির নেতা নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক। এবার যুক্তরাজ্যের প্রথম এশিয়ান এবং এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে মাত্র ৪২ বছর বয়সে সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ডও গড়তে যাচ্ছেন তিনি। আজ মঙ্গলবার সুনাককে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করা হতে পারে।
বিবিসি জানাচ্ছে, সুনাক টোরি (কনজারভেটিভ) এমপিদের অর্ধেকেরও বেশি জনের সমর্থন পেয়েছেন। অন্যদিকে পেনি মর্ডান্ট এমপিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ১০০ সমর্থন জোগাড় করতে না পেরে প্রতিযোগিতা থেকে সরে যান। এক বিবৃতিতে সুনাককে পূর্ণ সমর্থন দেন তিনি।
সুনাক যে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন, তা আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। লড়াই থেকে বরিস জনসন সরে যাওয়ার পর কার্যত নিয়মরক্ষার লড়াই ছিল সুনাকের। কারণ মরডান্টের পক্ষে ১০০ এমপির সমর্থন জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি সরে যেতেই নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে ঋষি সুনাকের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। দেশে গভীর বিভক্তি এবং অর্থনীতিতে মন্দার একটি সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চলেছেন।
বিবিসি বলছে, ঋষি সুনাকের জয় ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটি মোড় ঘোরানোর ঘটনা। কারণ এই প্রথম ব্রিটেনে একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসীর সন্তান, একজন অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটেনের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ পদে বসছেন। সুনাকের বাবা-মা ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও তারা থাকতেন পূর্ব আফ্রিকায় এবং সেখান থেকেই ব্রিটেনে এসে বসবাস শুরু করেন।
ঋষি সুনাকের জন্ম ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডের বন্দরনগরী সাউদাম্পটনে। তার বাবা সেখানে চিকিৎসক ছিলেন। মা একটি ফার্মেসি চালাতেন। ফলে পরিবার ছিল বেশ সচ্ছল। নাম করা প্রাইভেট স্কুল উইনচেস্টার কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। গ্র্যাজুয়েশন করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। ঋষি সুনাক ২০১৫ সালে প্রথম উত্তর ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার কাউন্টির রিচমন্ড এলাকার এমপি হন। ব্রেক্সিট অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনকে বের করে আনার পক্ষে কাজ করেছেন তিনি। ব্রেক্সিট গণভোটের প্রচারণার সময় পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন আরও মুক্ত, আরও সমৃদ্ধ দেশ হবে।
থেরেসা মে’র সরকারে ঋষি সুনাক স্থানীয় সরকার বিভাগে জুনিয়র মন্ত্রী হন। পরে বরিস জনসন ক্ষমতা নেওয়ার পর তাকে পদোন্নতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিফ সেক্রেটারি নিয়োগ করেন। বরিস জনসনের সঙ্গে মনোমালিন্য তৈরি হওয়ায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করলে অর্থমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক। কিন্তু ২০২২ সালে কভিড লকডাউন ভেঙে পার্টি করা এবং তা নিয়ে মিথ্যা বলার অভিযোগে প্রচণ্ড চাপে বরিস জনসন যখন হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন সুনাক।
অনেকে মনে করেন, তার পদত্যাগের মধ্য দিয়েই বরিস জনসনের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। বরিস সমর্থকরা তার বিরুদ্ধে সুযোগসন্ধানীর অভিযোগ আনলেও সুনাক বলেছিলেন, নৈতিক কারণে সে সময় তিনি সরে গিয়েছিলেন। বরিস জনসনের পদত্যাগের পরপরই নেতৃত্বের নির্বাচনে প্রার্থী হন ঋষি সুনাক। প্রচারণায় তিনি নিজেকে চৌকস একজন আর্থিক ব্যবস্থাপক হিসাবে তুলে ধরেন। তার প্রচারণার প্রধান বার্তা ছিল কভিড এবং ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে ব্রিটিশ অর্থনীতি ভীষণ সংকটে এবং তার প্রধান কাজ হবে এর সমাধান করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচনের ভোটে তিনি লিজ ট্রাসের কাছে হেরে যান। তার সরকারের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটে আর্থিক খাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় দলের ভেতর প্রচণ্ড চাপে পড়ে গত সপ্তাহে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। এর পরপরই আবারও নেতৃত্বের ব্যাপার তার প্রার্থিতা ঘোষণা করেন ঋষি সুনাক এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের নেতা নির্বাচিত হয়ে যান। মাত্র ৪২ বছরের সুনাক হবেন ব্রিটেনের ৫৭তম প্রধানমন্ত্রী এবং ১৮১২ সালের পর থেকে সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী।
