ধনকুবেরের জামাতার চমক

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২২, ০২:১৩ এএম

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন কোনো এশীয় বংশোদ্ভূত, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কোনো নাগরিক। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ মঙ্গলবারই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন ৪২ বছর বয়সী ঋষি। বরিস জনসনের মন্ত্রিসভায় তিনি ছিলেন ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী। করোনা মহামারীর মহা পরীক্ষায় দক্ষতার জন্য যুক্তরাজ্যে তাকে সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখেন অনেকে। আবার গেল নির্বাচনে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে দুর্দশা থেকে রক্ষায় কিছু কঠিন সিদ্ধান্তের জন্যও আলোচিত তিনি। এমনকি সদ্য বিদায় নেওয়া লিজ ট্রাসও শুরুতে সুনাকের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আবার হেঁটেছেন ঋষির দেখানো পথেই। মূলত এ জন্যই টালমাটাল যুক্তরাজ্যে ভরসা হয়ে উঠেছেন তিনি। 

 সুনাকের বাবা যশবীর ও মা ঊষা। দুজনই ভারতের পাঞ্জাবের বাসিন্দা ছিলেন। পড়াশোনা আর ভালো কাজের আশায় তারা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে শুরুতে পূর্ব আফ্রিকায়, এরপর সেখান থেকে ব্রিটেনে আসেন। যশবীর ব্রিটেনে একজন চিকিৎসক এবং ঊষা ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৮০ সালে ব্রিটেনের সাউদাম্পটনে জন্ম ঋষির। 

ঋষি সুনাক যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয় থেকে দর্শন রাজনীতি ও অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (এমবিএ) করেন। পরে ২০০১ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত বিখ্যাত গোল্ডম্যান স্যাক্সে বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি হেজ ফান্ড ব্যবস্থাপক হিসেবেও কাজ করেন।

ঋষি সুনাক ২০১৫ সালে ইয়র্কশায়ারের রিচমন্ড আসন থেকে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আর ২০১৯ সালে বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সরাসরি পান অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব। বর্তমানে ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টিতেও জনপ্রিয় মুখ সুনাক।

সুনাকের আরেকটি পরিচয় হলো তিনি ভারতের বিখ্যাত শিল্পপতি ও প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইনফোসিসের প্রতিষ্ঠাতা এন আর নারায়ণমূর্তির জামাতা। নারায়ণমূর্তির কন্যা অক্ষতার সঙ্গে তার আলাপ স্ট্যানফোর্ডেই, পরে তারা দুজন বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে রয়েছে।

ঋষি সুনাকের স্ত্রী অক্ষতাকে নিয়ে বিতর্ক আছে। গেলবার প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে ঋষি সুনাকের হারের জন্য কিছু ভারতীয় গণমাধ্যম তার স্ত্রী অক্ষতার দিকেই অভিযোগের আঙুল তোলে। ঋষির স্ত্রী ছাড়াও অক্ষতার একাধিক পরিচয় আছে। পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার অক্ষতা। ২০০৯ সালে বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠান করে ঋষি এবং অক্ষতার চার হাত এক হয়। ওই বছরের শুরুতেও আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন অক্ষতা। তার সম্পত্তি, আয়কর এবং রাশিয়ার সঙ্গে ‘বিশেষ সম্পর্কে’র কারণে তদন্তের আওতায় আসেন তিনি।

যেসব ব্যক্তি ব্রিটেনের বাইরের বাসিন্দা কিন্তু পেশা সূত্রে ব্রিটেনে রয়েছেন, তাদের সে দেশের সরকারকে একটি বিশেষ কর দিতে হয়। ‘প্রভাব খাটিয়ে’ সেই কর ফাঁকির অভিযোগ ওঠে অক্ষতার বিরুদ্ধে। ব্রিটেনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী হওয়ার আগে ঋষি তার সংস্থার বেশ কিছু শেয়ার অক্ষতার নামে স্থানান্তর করেন। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ইনফোসিসেও অংশীদারিত্ব রয়েছে অক্ষতার। এই সংস্থার অফিস রয়েছে রাশিয়াতেও।

কিয়েভের মস্কোর অভিযানের পর রাশিয়া থেকে আয় হয় এমন সব ব্যবসা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ব্রিটেনের প্রথম সারির রাজনীতিবিদ হওয়ার সুবাদে স্বাভাবিকভাবেই অভিযোগের তীর ছিল ঋষির দিকে। তবে ঋষি তার বা স্ত্রীর রাশিয়ায় ব্যবসা চালানোর কথা অস্বীকার করেন।

পরে অবশ্য ইনফোসিসের এক মুখপাত্র একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ইনফোসিস রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধকে সমর্থন করে না এবং শান্তি চুক্তির পক্ষে। রাশিয়ায় ইনফোসিসের একটি ছোট দল রয়েছে। সেখান থেকে কেবল আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের পরিষেবা দেওয়া হয়। রাশিয়ার সঙ্গে এই সংস্থার কোনো সক্রিয় সম্পর্ক নেই।

সুনাকের সম্পদ এবং প্রাইভেট স্কুলের পটভূমি নানা টিভি বিতর্কে বারবার আলোচনায় এসেছিল। তাকে ব্রিটেনের সবচেয়ে ধনী সংসদ সদস্যদের একজন মনে করা হলেও নিজের সম্পদের ব্যাপারে কখনোই প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি সুনাক।

ইউরোপ থেকে ব্রিটেনের বহুল আলোচিত বিচ্ছেদ ‘ব্রেক্সিটের’ সমর্থক ছিলেন তিনি। তখন ইয়র্কশায়ার পোস্টকে বলেছিলেন, তিনি বিশ^াস করেন ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যকে ‘মুক্ত, সুন্দর এবং আরও সমৃদ্ধ’ করে তুলবে। ব্রেক্সিট ভোটের আরেকটি মূল কারণ অভিবাসন বিধিতে পরিবর্তন আনা বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। সুনাক বলেছিলেন, ‘আমি বিশ^াস করি, উপযুক্ত অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আমাদের দেশের জন্য উপকার বয়ে আনতে পারে। কিন্তু আমাদের অবশ্যই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’

অথচ অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান সুনাক যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারী এক প্রজন্মের সদস্য। ২০১৯ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘এই পরিচয় তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ’। তিনি বলেছিলেন, আমার বাবা-মা এখানে অভিবাসী হিসেবে এসেছেন। তাই আপনি এই প্রজন্মের মানুষ পেয়েছেন; যাদের জন্ম এখানে। কিন্তু তাদের বাবা-মা এখানে জন্মগ্রহণ করেননি। তারা এসেছিলেন একটি জীবন গড়তে।’ 

নিজের ধর্ম-সংস্কৃতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি সপ্তাহ শেষের দিকে মন্দিরে থাকতাম। কারণ আমি একজন হিন্দু। তবে আমি শনিবার সেন্টস গেমেও থাকতাম। চাইলে সবই করা যায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত