কংগ্রেসের ভরসা কি এবার দক্ষিণ ভারত?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২২, ১০:০২ পিএম

রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস কি দক্ষিণ ভারতকে অগ্রাধিকার দেওয়া দল হিসেবে নিজেদের নতুনভাবে উদ্ভাবন করতে চাইছে? এজন্যই কি তারা উত্তর ভারতের পেছনে ‘রাজনৈতিক পুঁজি ঢালা’ বন্ধ করেছে? আমি কিন্তু বলব, তা-ই ঘটছে আসলে।

সারা দেশে সাংগঠনিক উপস্থিতি এবং ভোটের ২০ শতাংশের অধিকারী দেশটির প্রাচীনতম সর্বভারতীয় দল কংগ্রেস। দলটির দাবি, তারাই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে জোরদার বিজেপিকে মোকাবিলা করতে সক্ষম একমাত্র জাতীয় বিরোধী দল। এখন নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করে দেখা যাক

১. নতুন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে কর্ণাটকের মানুষ। ২. দলে সুবিশাল প্রভাব থাকা রাহুল গান্ধী কেরালার ওয়ানাদের সংসদ সদস্য। ৩. বর্তমানে রাহুল গান্ধীর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখা দলীয় নেতা কে সি বেনুগোপাল কেরালার বাসিন্দা। ৪. দলের সভাপতির পদে নির্বাচনের পরাজিত প্রার্থী শশী থারুরও দক্ষিণের লোক। তিরুবনন্তপুরম থেকে তৃতীয় মেয়াদে এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

রাহুল গান্ধী তার নিজস্ব রাজনৈতিক ব্র্যান্ড নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারই এক নতুন উদ্ভাবন হিসেবে সম্প্রতি দেশব্যাপী ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ মার্চ শুরু করেন তিনি। এই পদযাত্রাও শুরু হয় দক্ষিণের তামিলনাড়– থেকে। রাজ্যটিতে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর অন্ধ্রপ্রদেশে যায় এ পদযাত্রা। তবে রাহুল গান্ধী সতর্কতার সঙ্গেই নির্বাচনী রাজ্য গুজরাট এবং হিমাচল প্রদেশকে এড়িয়ে গেছেন।

মল্লিকার্জুন খাড়গে তার দলীয় প্রধানের নতুন দায়িত্বের পাশাপাশি রাজ্যসভায় বিরোধী দলের নেতার ভূমিকা অব্যাহত রাখলে সংসদের উভয় কক্ষের কংগ্রেস নেতারা হবেন উত্তরাঞ্চলের বাইরের। লোকসভায় কংগ্রেস দলের নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গের। খুব গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ বিভাগের দায়িত্বে নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ কর্ণাটকের। ভারতীয় যুব কংগ্রেসের জাতীয় সভাপতি শ্রীনিবাস বিভিও দক্ষিণের মানুষ।

আমি তামিলনাড়ু থেকে আসা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি দুটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে ৫০-৫৫ দিন কাটাবে। বাকি প্রায় ১০০ দিনের মতো উত্তরের সব রাজ্যের মধ্য দিয়ে যাবে।

আমি চিদাম্বরমকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কংগ্রেস দল ‘দক্ষিণী স্বাচ্ছন্দ্যে’ আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার জন্য উত্তর থেকে কম-বেশি পাততাড়ি গোটালো কি না। তবে দক্ষিণের এই জ্যেষ্ঠ নেতা স্পষ্টতই আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, দলে হাতেগোনা কয়েকজন পদধারীই দক্ষিণের।

এখন ভারতের মাত্র দুটি রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার রয়েছেরাজস্থান এবং ছত্তিশগড়। উত্তরে কংগ্রেস একদম মুছে গেছে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশে মাত্র ২ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যেখান থেকে লোকসভার ৮০ এমপি নির্বাচিত হন। এক কথায়, ভারতের উত্তরে দলটি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গত মার্চে অনুষ্ঠিত ইউপি বিধানসভা নির্বাচনে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে লড়া কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়। রাহুল গান্ধী ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে আমেথির পারিবারিক ঘাঁটি হারান।

বর্তমানে ইউপি থেকে কংগ্রেসের মাত্র একজন সাংসদ রয়েছেন। তা-ও রায় বেরেলি থেকে নির্বাচিত স্বয়ং সোনিয়া গান্ধী। ইউপিতে শেষবার কংগ্রেসের কোনো প্রভাব দেখা গেছে ২০০৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে। সেবার তারা রাজ্যের ৮০টির মধ্যে ২১টি আসন জিতেছিল। এরপর থেকে গান্ধী পরিবারকে সেখানকার ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আলাদাভাবে সেখানে আঞ্চলিক প্রভাবশালী দলগুলোর সঙ্গে জোট করে ও বিনা জোটে ভাগ্য পরীক্ষা করে ব্যর্থ হয়েছেন।

ভারতের যেকোনো রাজনৈতিক দলের মতো কংগ্রেসও এত দিন দলের পদাধিকারীদের মধ্যে আঞ্চলিক বা বর্ণগত ভারসাম্যহীনতা সম্পর্কে সতর্ক ছিল। দলটির বর্তমানের দক্ষিণমুখী ঝোঁক উত্তরাঞ্চলে এখনো ঘাঁটি আগলে রাখা নেতাদের বিরক্ত করছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন আরও ‘লাভজনক’ দল-পদ খুঁজে নিয়ে বেরিয়ে গেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কংগ্রেস নেতা বলেন, ‘ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে এমনকি রাজীব গান্ধীর আমলেও এমনটা কখনোই হতো না। তারা অঞ্চল এবং বর্ণের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কার (এটি) না জানা থাকলে তাদের ‘পরিচালনাকারীদের উচিত ভাই-বোনকে এটা বোঝানো যে, উত্তরের ভোটারদের আসলে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, দলে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার কেউ নেই। আর আপনি তাদের স্বার্থ বা ভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও বিশেষভাবে চিন্তিত নন।

মল্লিকার্জুন খাড়গের উচিত উত্তরের একজন কংগ্রেস নেতাকেই লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা করা। তবে দলীয় গুঞ্জন অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দিগি¦জয় সিংকে এই পদটি দেওয়া হতে পারে। ভারসাম্যের চেষ্টা হিসেবে পরিকল্পিতভাবেই তা করা হচ্ছে।

উত্তর ভারতে, বিশেষ করে ইউপিতে বিজেপির অতি-প্রাধান্যই হয়তো কংগ্রেসকে দক্ষিণে আশা খুঁজতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এই কৌশল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে পারে। ইউপি, মহারাষ্ট্র ও বিহারে যথাক্রমে ৮০, ৪৮ ও ৪০টি লোকসভা আসন রয়েছে। মহারাষ্ট্র ও বিহারে কংগ্রেস নিজেদের সেখানকার সরকারের কনিষ্ঠ অংশীদারে পরিণত করেছে।

ইউপি যে আপাতত কংগ্রেসকে বাদ দিয়েছে তা ওপরেই বলা হয়েছে। তামিলনাড়–তে রাজ্যের ৩৯টি লোকসভা আসনের মধ্যে কংগ্রেসের হাতে রয়েছে ৮টি। এর বদৌলতে দলটির মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের এক ছোটখাটো জোটমিত্র। পি চিদাম্বরম বলেছেন, স্ট্যালিনের সঙ্গে কংগ্রেসের সমীকরণটা ভালো ও সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং তিনি ২০২৪-এর সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করবেন। কিন্তু ‘জুনিয়র পার্টনার’ হয়ে কি কেন্দ্রে সাফল্যের জন্য ঝাঁপ দেওয়া যায়? কংগ্রেসকে এর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।

বিজেপির সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা রাজ্যগুলোতে কংগ্রেস তার ভোটে ভাগ বসানোর জন্য আম আদমি পার্টিকে (এএপি) দোষারোপ করে চলেছে। তবে কংগ্রেস তার নিজের দুরবস্থার জন্যই সব জোট ও আঞ্চলিক দলের জুনিয়র অংশীদারে পরিণত হয়েছে। শিগগিরই ভোট হতে যাওয়া রাজ্য গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশে কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার চেষ্টাও করছে না। কংগ্রেসের অনুপস্থিতির কারণে সৃষ্ট শূন্যতায় জায়গা করে নিতে সেখানে পা বাড়াচ্ছে এএপি।

লেখক : ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক

এনডিটিভি অনলাইন থেকে

ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত