প্রত্যাবাসন জটিলতায় খুনোখুনি!

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২২, ০১:৪২ এএম

মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও কুতুপালং ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুই রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। এর আগে গত বুধবার ও মঙ্গলবার ওই এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন আরও দুই রোহিঙ্গা যুবক। এ নিয়ে গত পাঁচ মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে শিশুসহ ২১টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত পাঁচ বছরেও কোনো প্রত্যাবসন না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। প্রত্যাবাসন নিয়ে দুটি পক্ষ তৈরি হওয়ায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গত দুই মাস ধরে মিয়ানমার সীমান্তের গোলাগুলি। সবমিলিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা আরও বেড়েছে। খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মানব ও মাদক পাচারসহ ১৪ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে রোহিঙ্গারা।

১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক এআইজি চৌধুরী হারুনুর রশিদ জানান, গতকাল নিহতরা হলেনক্যাম্প ১৭ এর সি ব্লকের বাসিন্দা কেফায়েত উল্লার ছেলে আয়াত উল্লাহ (৪০) ও একই ক্যাম্পের মোহাম্মদ কাসিমের ছেলে মোহাম্মদ ইয়াছিন (৩০)। ভোররাতে ক্যাম্প ১৭ এর সি-ব্লকের এইচ/৭৬ এ দুজন রোহিঙ্গাকে গুলি করে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এসময় ঘটনাস্থলেই মারা যান ইয়াছিন। গুরুতর আহত অবস্থায় আয়াত উল্লাহকে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১১৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে গতকালের ঘটনা বাদে পাঁচ মাসে ১৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও সংস্কৃতির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক বছর ধরেই ক্যাম্পে অস্থিরতা রয়েছে। এর মধ্যে গত দু মাস মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলির কারণে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ক্যাম্পে এখন ধর্ষণ, অপহরণ, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানি।

রোহিঙ্গারা বলেছেন, প্রতিদিন সন্ধ্যা হলে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র নিয়ে টহল দেয়। তুচ্ছ ঘটনায় গুলি চালায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এত অস্ত্র আসে কোথা থেকে তা নিয়েও প্রশ্ন তাদের। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের এই অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও হিমশিম খাচ্ছে। তারা বলছেন, ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধ কমিয়ে না আনতে পারলে স্থানীয়রা বিপদে পড়বে। তারা বলছেন, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার পর ক্যাম্পের ভেতরে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বেড়েছে।

টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে আর্মড পুলিশ তিনটি ব্যাটালিয়নের নিরাপত্তায় নিয়োজিত। এপিবিএন বলছে, ২২ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ এরশাদ (২২) নামে এক স্বেচ্ছাসেবক খুন হন। ২১ সেপ্টেম্বর খুন হন মোহাম্মদ জাফর (৩৫) নামে এক নেতা (মাঝি)। ১৮ সেপ্টেম্বর খুন হন আরেক স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ ইলিয়াস (৩৫)।  ৯ আগস্ট দুই রোহিঙ্গা নেতা, ৮ আগস্ট টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক স্বেচ্ছাসেবক খুন হন। ১ আগস্ট একই ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক নেতা মারা যান। ওই দিন উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকও নিহত হন।  গত ২২ জুন কথিত আরসা নেতা মোহাম্মদ শাহ এবং ১৫ জুন একই গ্রুপের সদস্য মো. সেলিম (৩০) সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। ১৬ জুন রাতে উখিয়া ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবক, ১০ জুন কুতুপালংয়ের ৪ নম্বর ক্যাম্পের আরেক স্বেচ্ছাসেবক, ৯ জুন এক রোহিঙ্গা নেতা, জুনের শুরুতে ও মে মাসে খুন হন রোহিঙ্গা নেতা সানাউল্লাহ (৪০) ও সোনা আলী (৪৬)।

৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সহকারী পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদ জানান, ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর ক্যাম্প-১৮ এর একটি মাদ্রাসায় ৬ জনকে হত্যা করা হয়। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর হত্যা করা হয় রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে। এসব হত্যাকাণ্ডের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে সকলেই যখন উদ্বিগ্ন, তখন বিকল্প হিসেবে চালু হয় স্বেচ্ছায় পাহারার। ক্যাম্পটির প্রতিটি ব্লকে ৫ জন করে রাতে স্বেচ্ছায় পাহারা দেওয়া শুরু করে। এরপর পর্যায়ক্রমে ৮ এপিবিএনের আওতাধীন ১১টি ক্যাম্পের ৬৪টি ব্লকের ৭৭৩টি সাব-ব্লকে চালু হয় এ স্বেচ্ছায় পাহারার ব্যবস্থা। প্রতিরাতে ৩ হাজার ৮৬৫ জন রোহিঙ্গা পাহারা দিচ্ছে ১১টি ক্যাম্পে। তারা কোনো সন্দেহজনক লোকের আনাগোনা, চিহ্নিত অপরাধী, মাদক বেচাকেনাসহ নানা অপরাধের তথ্য দিচ্ছে এপিবিএনকে।

মো. ফারুক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২৩ অক্টোবর থেকে ক্যাম্পের ভেতরেই স্বেচ্ছায় পাহারার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থাটি ইতিমধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে, ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ অপহরণ চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধ কমতে শুরু করেছে। আবার অন্য দিকে মাদক উদ্ধারের পরিমাণও বেড়েছে। এই কর্মকর্তা জানান, জামতলী ক্যাম্প থেকে চালু হওয়া স্বেচ্ছায় পাহারার ব্যবস্থা এখন উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলছে। তিনি জানান, স্বেচ্ছায় পাহারা দেওয়ার এই পদ্ধতির কারণে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা প্রতিবন্ধকতায় পড়েছে। যার জের ধরে এসব অপরাধীরা এখন স্বেচ্ছাসেবক এবং মাঝিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে টার্গেট করেছে। এতে স্বেচ্ছাসেবক ও মাঝিরাও হত্যার শিকার হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে ক্যাম্পের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।

উখিয়ার কুতুপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, দিনে দিনে ক্যাম্পের পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। আমিও বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ ক্যাম্পভিত্তিক মাঝি, সাব মাঝি ও স্বেচ্ছাসেবকদের খুন করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের অবস্থান ঘোষণা করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বড় সমস্যা হলো রোহিঙ্গারা স্বাভাবিকভাবে কাউকে নেতা মানতে চান না। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের নেতৃত্বশূন্য করার কোনো মিশন সশস্ত্র গোষ্ঠী বা ভিন্ন কোনো মহল পরিচালনা করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন,  এমনিতেই দীর্ঘদিন ছোট জায়গায় বদ্ধ থাকার কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। তাদের সামনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই, যার ফলে তারা কি করবে না করবে সেই জায়গা থেকে অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর মধ্যে সীমান্তে গোলাগুলির কারণে তাদের নিজের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি আরও দোটানায় পড়েছে। টেকনাফ-উখিয়ায় এই অল্প জায়গায় বিপুল জনগোষ্ঠী যেভাবে থাকছে তাতে অপরাধ আরও বাড়বে। এখনই সতর্ক হতে হবে। তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং মোটিভেশনাল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। যতদিন  প্রত্যাবাসন না হয় সেই সময়ের মধ্যে আরও বেশি পরিমাণ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পাঠাতে হবে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাদের কারণে আমাদের চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পও হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

-প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কক্সবাজার প্রতিনিধি আবদুল আজিজ ও উখিয়া প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত