তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) প্রভাবের কারণে সংশোধিত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না।
সাত বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ (২০১৩ সালে সংশোধিত) আরেক দফা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় ট্যোবাকো কন্ট্রোল সেল (এনটিসিসি)। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দেশের অর্থনীতির বাস্তবতা আমলে নিচ্ছে না। আইন সংশোধনে খাত-সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হচ্ছে না। কয়েকটি বিদেশি এনজিওর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ঝিমিয়ে পড়েছে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন। আর এজন্য জাতীয় ট্যোবাকো কন্ট্রোল সেলকে (এনটিসিসি) প্রভাবিত করছেন কয়েকজন সাবেক আমলা। যারা এনজিওগুলোতে উচ্চ বেতনে কর্মরত রয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের পরিচালক কাজী জেবুন্নেছা বেগম গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনে খসড়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে। সরকার এনজিওর জন্য কাজ করে না। সরকার কাজ করে জনগণের জন্য, এনজিওর জন্য নয়। সুতরাং তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনে কোনো এনজিওর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইন সংশোধনের বিষয়ে চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অন্তত পাঁচটি এনজিওর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তার তিন দিন আগে ১৫ সেপ্টেম্বরও একই বিষয়ে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এনজিও প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশাধন সম্পর্কিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এনটিসিসির সর্বশেষ সাতটি বৈঠকের চিঠি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি বৈঠকে অংশ নিয়েছেন নির্ধারিত কয়েকটি এনজিওর প্রতিনিধিরা। এ কারণে অভিযোগ উঠে যে, তারা বিভিন্ন অজুহাতে আইন সংশোধন বিলম্বিত করার চেষ্টা করছেন।
সাতটি বৈঠকের প্রতিটিতে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন (যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক) এনজিও সিটিএফকে ও দ্য ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা। এছাড়া ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস ও গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর নামে দুটি বিদেশি এনজিওর সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। সাতটি বৈঠকের ছয়টিতেই উপস্থিত ছিলেন দ্য ইউনিয়নের কারিগরি পরামর্শক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, পাঁচটিতে উপস্থিত ছিলেন ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের হেড অব প্রোগ্রাম শফিকুল ইসলাম, চারটিতে উপস্থিত ছিলেন ক্যাম্পেইন ফর ট্যোবাকো ফ্রি কিডস সিটিএফকের লিড পলিসি অ্যাডভাইজার মোস্তাফিজুর রহমান।
বৈঠকগুলোতে অংশ নেওয়া ৯ এনজিও প্রতিনিধির ৫ জনই সাবেক আমলা। দ্য ইউনিয়নের পরামর্শক ফাহিমুল ইসলাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব। এছাড়া হামিদুর রহমান যুগ্ম সচিব থাকাকালে দ্য ইউনিয়নে লিয়েনে ছিলেন। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হলেও অংশ নিচ্ছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আইন সংশোধনের মিটিংয়ে। ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের হেড অফ প্রোগ্রামস শফিকুল ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ছিলেন। সিটিএফকের মুখ্য পরামর্শক শরিফুল আলমও সাবেক উপ-সচিব।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কয়েকটি এনজিওর প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের সব শ্রেণির মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আইন সংশোধনে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিদেশি এনজিওগুলো আইন সংশোধনের প্রক্রিয়াকে ভিন্নদিকে নিচ্ছে।
এদিকে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, আইন সংশোধনে তাদের আলোচনায় ডাকা হচ্ছে না। এনজিওগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এনটিসিসি আইন সংশোধনের বিষয়টি স্থবির করে রেখেছে।
স্বাস্থ্য সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে না জেনে কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান।
