রাইলি রুশো যদি একাই একটা দেশ বা প্রতিপক্ষ হতেন, তাহলেও বাংলাদেশ ম্যাচটা হারত ৮ রানে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই ব্যাটসম্যান কাল সিডনিতে খেলেছেন ৫৬ বলে ১০৯ রানের ইনিংস। বাংলাদেশের ১১ জন মিলে ৯৯ বল খেলেছেন, রান করেছেন ৯২, চার হয়েছে তিনটি আর ছয় হয়েছে চারটা। একলা রাইলি রুশোর কাছেই যখন এমন হার, তাহলে বাকি স্কোরকার্ডের আর কী দরকার! দক্ষিণ আফ্রিকাও খানিকটা চাপে থাকবে, মাঠে হিরো খুঁজছি... এমন অনেক কিছুই সাকিব আল হাসান বলেছিলেন আগের দিনে। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংয়ে অবশ্য ওসব চাপটাপ দেখা যায়নি। টেম্বা বাভুমা টস জিতে নিজেই শুরুতেই নেমে পড়েন এবং চটজলদি বিদায় নিয়ে দলকে ভারমুক্তও করে দেন। কুইন্টন ডি ককের সঙ্গে ওয়ান ডাউনে নামা রাইলি রুশোর মারের শুরু সেখান থেকেই। পাওয়ার প্লেতে ৬ ওভারে ৬৩, এরপর ১০ ওভারে ৯৬। রুশো-ডি কক মিলে ইচ্ছেমতো মারছেন বাংলাদেশের বোলারদের, বাদ যাচ্ছে না স্পিন-পেস কোনো কিছুই। ওদিকে ভুলভাল আপিলে দুটো রিভিউ খুইয়েছে বাংলাদেশ, নুরুল হাসান সোহানের ‘কল্যাণে’ এই রানবন্যার মাঝেও ৫ রান পেনাল্টি পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
তাসকিন শুরুর ওভারটা ভালোই করেছিলেন। বাভুমাকে আউট করেছিলেন, যদিও রেখে দিলেই হয়তো ভালো হতো। নিজের দ্বিতীয় ওভারে রুশোকে দুটো বল করলেন, রুশোও দেখেশুনে ছাড়লেন। তৃতীয় বলে চার। এরপর পরপর দুটো নো বলে প্রথমটায় চার এবং পরের বল ওয়াইড। ফ্রি হিটে ছয় আর পরের বলে চার ওই এক ওভারেই উঠে গেল ২১ রান। সেই থেকে ছন্দ পেয়ে যাওয়া প্রোটিয়ারা গিয়ার কমাল বরং শেষে। রানরেট যেদিকে ছুটছিল তাতে ২৩০ রান হতে পারত অনায়াসেই। তবে ১৮, ১৯ আর ২০তম ওভারে সেই আন্দাজে রান এসেছে কম। ১৮তম ওভারে ৫, ১৯ নম্বর ওভারে ৪ আর শেষ ওভারে ৬। সাকিবের করা ম্যাচের ১৮তম ওভারের তৃতীয় বলে রুশো আউট হয়েছেন লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে। তারপর ডেভিড মিলার, এইডেন মার্করামরা খুব একটা মারমুখী হননি বলেই ২০৫ রানেই থেমেছে প্রোটিয়াদের ইনিংস।
বাংলাদেশের শুরুটা অন্তত খারাপ হয়নি। দ্বিতীয় বলেই চার নাজমুল হোসেন শান্তর, প্রথম ওভারের শেষ দুই বলে পরপর দুটো ছয় সৌম্যর ব্যাটে। দ্বিতীয় ওভারে বাউন্ডারি না এলেও সিঙ্গেলস-ডাবলসে এলো ৯ রান। ২ ওভার শেষে বিনা উইকেটে ২৬ বাংলাদেশ। এরপরই শুরু আত্মাহুতির পালা। ম্যাচে এনরিখ নরকিয়ার প্রথম ডেলিভারিতেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ সৌম্য’র।চতুর্থ বলে বোল্ড শান্ত। নিজের দ্বিতীয় ওভারে নরকিয়ার বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে সাকিব, যদিও মনে হচ্ছে রিভিউ নিলে বাঁচার আশা ছিল তার কিন্তু অধিনায়ক কেন যে নেননি সেটা তিনিই জানেন। পাওয়ার প্লে শেষের আগের বলে রাবাদা আফিফ কে বোল্ড করলেই আসলে শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের সব সম্ভাবনা। বাকিটা আনুষ্ঠানিকতা। সেটাও শেষ হয় দ্রুত। ১৬.৩ ওভারে ১০১ রানেই শেষ বাংলাদেশ, হার ১০৪ রানে। লিটন দাসের ৩৪ রানের ইনিংসটা দলের সর্বোচ্চ। সৌম্য ১৫, মিরাজ ১১ আর তাসকিন ১০ রান করেন, বাকিরা কেউ দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পারেননি।
ভালো উইকেটেও ভালো শুরুর পর ব্যাটিংয়ে ভালো না করার আক্ষেপ আছে সাকিবের, সেই সঙ্গে দলের ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। প্রতিপক্ষের একজনের সমান যে দল সবাই মিলে করতে পারে না, সেই দলের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক যদিও সাকিবের ব্যাখ্যা বড় রান তাড়ায় অলআউট খেলতে গেলে এমন হবেই, যেটা অস্ট্রেলিয়ারও হয়েছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।
সিডনিতে ‘নায়ক’ খুঁজেছিলেন সাকিব, পেয়ে গেছেন ‘খলনায়ক’ যে আবার খুব চেনা। রাইলি রুশো বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন তিন মৌসুম। ‘কলপাক’ খেলোয়াড় হয়ে দেশের কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরে চলে যান ২০১৬ সালে, ফিরেছেন এ বছরের জুলাইতে। টি-টোয়েন্টিতে এরপর যেন রানের স্রোত বইছে ব্যাটে। কার্ডিফে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৬*, ইন্দোরে ভারতের বিপক্ষে মাত্র কয়দিন আগে ১০০* আর বাংলাদেশের বিপক্ষে গতকাল ১০৯। উদযাপনের ভঙ্গিটাই বলে দিচ্ছিল, দেশের হয়ে খেলতে পেরে কতটা রোমাঞ্চিত রুশো। বাংলাদেশের চোখে খলনায়ক হলেও রুশো তো প্রোটিয়াদের কাছে এই বিশ্বকাপে দলের প্রথম জয়ের নায়কও। সেই সঙ্গে আসরের প্রথম শতরানটা করে নাম তুলে ফেললেন ইতিহাসেও।
