সমাবেশ ও পরিবহন ধর্মঘটের সংস্কৃতি

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২২, ১০:৩৮ পিএম

কী যে একটা পরিস্থিতি হয়েছে দেশে! নদীর মধ্যে জেগে ওঠা ডুবো চরের মতো এখানে-ওখানে ডাকা হচ্ছে পরিবহন ধর্মঘট। ছোট বাচ্চারা মাঝে মাঝে নিজের ছায়ার সঙ্গে খেলে। সে যেখানে যায় ছায়াও সেখানে যায়। ছায়াকে ধরে ফেলার এই খেলায় উত্তেজনা আছে আবার আনন্দও আছে। বড়রা দেখে হাসে আর আদর-মাখানো কণ্ঠে বলে, বোকা কোথাকার! তেমনি মনে হয় একদল বিভাগীয় সমাবেশ ডাকে আর সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ধর্মঘট হয়ে যায়। একেকটা বিভাগে ৮টা জেলা, বিভাগীয় সমাবেশে জেলা থেকে নেতাকর্মীরা আসবেন এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবহন ধর্মঘট হলে তারা আসবেন কীভাবে? এ যেন বাচ্চাদের ছায়ার সঙ্গে দৌড়ানোর মতো। সুকুমার রায়ের ভাষায়, ছায়ার সঙ্গে কুস্তি লড়ে গাত্রে হলো ব্যথা। ছায়াকে ধরতে পারে না কিন্তু ক্লান্ত, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ হতে থাকে ক্রমাগত। তেমনি কি রাজনীতিতেও চলছে। একপক্ষ সমাবেশ ডাকে তো অন্যদের ইশারায় পরিবহন ধর্মঘট। এবং এ নিয়ে চলছে বিতর্ক। ওরা আগে করেছে তখন দোষ হয়নি তাহলে আমরা করলে দোষ হবে কেন? কে কার ঘাড়ে দোষ চাপাবে তার কৌশল চলছে। তবে কৌশল যাই হোক আর যেই করুক শেষ পর্যন্ত ঘাড়টা জনগণের এবং বোঝাটা বহন করতে হবে তাদেরই। সে বোঝা দুর্ভোগের, ভাড়া বৃদ্ধির, দ্রব্যমূল্যের অথবা পুলিশি হয়রানির আরও অনেক কিছুর।  

একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশকে সামনে রেখে ২৮ ও ২৯ অক্টোবর রংপুর বিভাগে পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছে। মালিক সমিতি কি ধর্মঘট আহ্বান করতে পারে কিংবা শ্রমিক সংগঠন ধর্মঘট আহ্বান করলে কী নিয়ম অনুসরণ করতে হয় তা নিয়ে প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না। তবে ধর্মঘট হবে, বাস বন্ধ থাকবে এবং ময়মনসিংহ, খুলনার ধারাবাহিকতায় রংপুরের পর বরিশালেও ধর্মঘট হবে। মালিক সমিতির কেউ কেউ বলছেন, কেন ধর্মঘট ডাকা হয়েছে তা তো জানেন, তাহলে প্রশ্ন করেন কেন? ধর্মঘট আহ্বানকারীদের দাবিগুলো দেখলে বোঝা যায় এ হলো স্থায়ী দাবিতে অস্থায়ী কর্মসূচি। তারা বলেছে, মহাসড়কে তিন চাকার অবৈধ যান ও ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল বন্ধ করতে হবে। এদের কারণে দুর্ঘটনা হয়, বাসমালিকরা যাত্রী পান না। ফলে এসব বন্ধ করতে হবে। এই দাবিতে রংপুরে ২৮-২৯ অক্টোবর এবং আগামী ৪-৫ নভেম্বর বরিশাল থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বাস মালিকদের সংগঠন বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপ। অন্যদিকে ৫ নভেম্বর বরিশালে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে একই কায়দায় খুলনা ও ময়মনসিংহে ওই একই দলের গণসমাবেশের আগে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়। যদি কেউ বলেন একই দাবিতে ধর্মঘটের আহ্বান একটি বিশেষ দলের কর্মসূচির সময়েই কেন বারবার ডাকা হচ্ছে, সারা বছর কেন ডাকা হয় না? তাহলে কি সমাবেশ ও ধর্মঘটের মধ্যে যোগসূত্র আছে? ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে সব সময়ই জোরের সঙ্গে বলা হচ্ছে এ ধর্মঘটের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। ঐক্য আছে কিন্তু সম্পর্ক নেই। কি অদ্ভুত সম্পর্কহীন ঐক্য!   

রংপুরের ধর্মঘট আহ্বানের কারণ এবং পদ্ধতি জানা না গেলেও বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে বাস মালিক সমিতির নেতারা তাদের ভয়াবহ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। যদি প্রশাসন তাদের দাবি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন তাহলে ৪-৫ নভেম্বর বরিশালের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও অভ্যন্তরীণ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ রাখা হবে। জিজ্ঞাসা হতে পারে, এই দাবিতে আগে তারা কী কী কর্মসূচি পালন করেছেন, সে ক্ষেত্রে পুলিশ এবং প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল সে সম্পর্কে অবশ্য কিছু জানা যায়নি এবং আন্দোলনকারীরা নিজেরাও তা উল্লেখ করেননি। যেকোনো চূড়ান্ত কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে কিছু আন্দোলন তো করতে হয়। সে রকম কোনো আন্দোলনের খবর কেউ জানেন কি না তা জানা নেই। 

সংসদে তেমন প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও কার্যত বিএনপি বর্তমান সরকারের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বলে সমস্ত আলোচনা এই দুই দলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে থাকে। সামনে নির্বাচন। এই নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে যেমন বিতর্ক ও মতভেদ আছে তেমনি দলীয় ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতাও চলছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ময়মনসিংহে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশের আগে দেখা গেল অভ্যন্তরীণ রুটসহ ময়মনসিংহ থেকে আন্তঃজেলা রুটে বাস চলাচল করছে না। এতে সাধারণ যাত্রীরা পড়লেন ভয়ানক দুর্ভোগে। আবার খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা থেকে যাওয়া কোনো গণপরিবহন খুলনায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বন্ধ রাখা হয়েছিল লঞ্চ যোগাযোগও। আগের রাতে বন্ধ হয়ে যায় খুলনা শহরের প্রান্তে রূপসা নদীর খেয়া পারাপার। এরপর আশ্চর্য ব্যাপার দেখা গেল যে, সকাল থেকে কোনো ট্রেন আসছে না।

স্বাভাবিকভাবেই সমাবেশ আয়োজনকারীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের গণসমাবেশে মানুষের স্রোত ঠেকাতে এই সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পরিবহন-সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, তাদের কিছু দাবি-দাওয়া ছিল, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের জন্য তারা সরকারকে এবং সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কিন্তু কর্র্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা শেষ পর্যন্ত যানবাহন বন্ধ করে ‘আন্দোলন’ করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে দুঃখজনকভাবে তাদের এই আন্দোলন কাকতালীয়ভাবে আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দলের সমাবেশের আগের দিন থেকে সমাবেশের পরের দিন পর্যন্ত পড়ে গেছে। কি আর করা! উপায়হীন বেদনা প্রকাশ।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেছিলেন, বাসমালিকরা কেন খুলনার বাস বন্ধ রেখেছেন, সে বিষয়ে তারা আমাদের অফিশিয়ালি কিছু জানাননি। কোনো দাবি-দাওয়াও উপস্থাপন করা হয়নি। আমরা এ ব্যাপারে জানি না। খুলনা জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস মালিক সমিতির সভাপতি আওয়ামী লীগের খুলনা মহানগর নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেছিলেন, ধর্মঘটের সঙ্গে বিএনপির সমাবেশের কোনো সম্পর্ক নেই। একের পর এক ধর্মঘটের খবর আসছে, বিস্ময়ের শেষ নেই। লঞ্চ শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো, ভৈরব থেকে নওয়াপাড়া পর্যন্ত নদের খনন, ভারতগামী জাহাজের ল্যান্ডিং পাস দেওয়ার দাবিসহ ১০ দফা দাবিতে ধর্মঘট পালন করেছেন যাত্রীবাহী লঞ্চের শ্রমিকরা। এখন কি অবস্থা তাদের আন্দোলনের, তা জানতে অনেকের কৌতূহল জেগে ওঠা অসম্ভব নয়।

সরকার একবার ঘোষণা করেছিল জরুরি প্রয়োজনে বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহনসহ যেকোনো সেবাকে ‘অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা’ ঘোষণা করতে পারবে। ‘অত্যাবশ্যক’ ঘোষণার পর সেখানে শ্রমিকরা ধর্মঘট ডাকতে পারবে না, এমনকি মালিকরাও প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে পারবেন না। এই ঘোষণা না মানলে দণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন করার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা আইন, ২০২১’ নামে এই আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। সে সময় করোনার কারণে মন্ত্রিসভার এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে এতে সভাপতিত্ব করেন। এবং সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। সেই বৈঠকের পর সচিবালয়ে সে সময়ের মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘সরকার কোনো সময় জরুরি প্রয়োজনে বিভিন্ন সেবাকে অত্যাবশ্যক পরিষেবা ঘোষণা করতে পারবে। অত্যাবশ্যক ঘোষণার পর কর্মীরা বেআইনিভাবে ধর্মঘট ডাকতে পারবেন না, মালিকরা কারখানা বন্ধও করতে পারবেন না, লে-অফও করতে পারবেন না।’ কোন কোন সেবা এর আওতায় থাকবে তার ব্যাখ্যায় তিনি তখন বলেছিলেন, ‘ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল, ডিজিটাল আর্থিক সেবাসহ যেকোনো ডিজিটাল সেবা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ, জল, স্থল ও আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, বিমানবন্দর পরিচালনা, স্থল ও নদীবন্দর পরিচালনা, কাস্টমসের মাধ্যমে কোনো পণ্য ও যাত্রীর পণ্য ছাড় করার কাজ, সশস্ত্র বাহিনীর কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কার্যক্রম, প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রম, খাদ্যদ্রব্য ক্রয়, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রম ইত্যাদি। সরকার কোনো কারণে এগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। ‘এই ঘোষণা সর্বোচ্চ ৬ মাসের জন্য হবে।’ এর কোনো কার্যকারিতা বা প্রয়োগ কি আছে কোথাও? এই আইন অমান্য করলে দণ্ডের বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, কেউ ধর্মঘট করলে তাকে বরখাস্তসহ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন ভাঙলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা ৬ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। মালিক ভাঙলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হবে। কেউ আইন ভাঙতে প্ররোচিত করলে এক বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। একদিকে করোনা অভিঘাত, অন্যদিকে রুশ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির সংকটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন টালমাটাল, তখন বাস-ট্রেন-লঞ্চ বন্ধ করে রাখা কি অর্থনীতির জন্য বিরাট ধাক্কা নয়? বেআইনি এই ধর্মঘটের জন্য কাউকে কি জরিমানা করা হবে?

রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে এ কথা সবাই বলেন কিন্তু রাজনৈতিক সমাবেশ এবং পরিবহন ধর্মঘটের ঘটনা যে ঘটেই চলেছে তা দেশের মানুষকে কী বার্তা দেবে? দলীয় কর্মী দিয়ে হামলা, মামলা, গ্রেপ্তারসহ ক্ষমতায় থাকলে সব ধরনের নিজেদের ক্ষমতা দেখানোর এই সংস্কৃতির অবসান কি হবে? অতীতেও বিরোধী দলের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে গাড়ি, ফেরি বন্ধের নানা নজির আছে। সেই খারাপ নজিরগুলোই কি বর্তমানে চর্চা হতে থাকবে। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হলো পরমতসহিষ্ণুতা। ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শর্ত পূরণ করা যাবে না কিছুতেই। পরিবহন মালিক শ্রমিক দিয়ে বিরোধী দলের সমাবেশকে কষ্টকর করে তোলার এই প্রক্রিয়া কোনো সুস্থ রাজনীতির পরিচয় বহন করে না, এই উপলব্ধি আসবে কবে?

লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত