মন্দা ও দুর্ভিক্ষে খাদ্য নিরাপত্তায় করণীয়

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২২, ১০:৪১ পিএম

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ^নেতৃবৃন্দ বলছেন, ২০২৩ সালে পৃথিবীতে বিশ্বমন্দা ও দুর্ভিক্ষ ধেয়ে আসছে, সেই বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলার শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে কৃষি। যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশবাসীকে অধিক খাদ্য উৎপাদনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বসম্প্রদায় আগামী বছরে একটি সংকটের আশঙ্কা করছে। তাই খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। এটি এখন আমাদের জন্য অপরিহার্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্প্রতি (১৩.১০.২০২২) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভার প্রারম্ভিক বক্তব্যে এ আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়াল বৈঠকে যোগ দেন তিনি। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা, বিশেষ করে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সবাই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ২০২৩ সালে একটি গুরুতর দুর্ভিক্ষ হতে পারে, যখন অর্থনৈতিক  মন্দা অবস্থা আরও গভীর হবে এবং খাদ্যসংকট দেখা দেবে। আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সুতরাং আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে এবং খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে শতভাগ সহমত পোষণ করি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জনগণকে কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা কোনো অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়াব না। বরং বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি, গ্যাস ইত্যাদি ব্যবহারে আরও সাশ্রয়ী ও সচেতন হব। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি পরিবারকে তাদের সাধ্যমতো সঞ্চয় করতে হবে।

দেশে বোরো মৌসুমে এ বছর প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়। আগাম বন্যায় দেশের হাওর এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাকা বোরো ধান তলিয়ে ক্ষতি হয় উৎপাদনের ১০ থেকে ১৫ ভাগ এবং সাম্প্রতিক বন্যায় ৫৬ হাজার হেক্টর জমির আউস ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কমেছে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টন। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়েছে। এবার আমন চাষ পিছিয়ে যাওয়ায়  স্বাভাবিকভাবে পিছিয়ে যাবে বোরো গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, ডাল ও তেলবীজের চাষ। এতে উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আশার কথা, সরকার ইতিমধ্যে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে বেশ ক’টি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিষয়গুলো হচ্ছে: ১. সার, বীজ ও বালাইনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা। ২. সময়মতো সেচ সুবিধাপ্রাপ্তি। ৩. সহজে ও স্বল্পসুদে কৃষিঋণপ্রাপ্তি। ৪. উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা ইত্যাদি। সম্প্রতি ইউরিয়া সারের দাম সরকারিভাবে কেজিপ্রতি ৬ টাকা বৃদ্ধির অজুহাতে এক শ্রেণির ডিলার ও অসৎ সার ব্যবসায়ী পটাশ, টিএসপি ও ডিএপি সার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করছে। কোথাও কোথাও ১৫ টাকা কেজির পটাশ সার বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা কেজি দরে। এ কারণে কৃষক এবারের আমন মৌসুমে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে পারেনি। আগামী রবি মৌসুমে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে ব্যাপারে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে আমন ধানের জমিতে মাজরা পোকা ও পাতা মোড়ানো পোকার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এসব পোকা দমনে এখনই মাঠ পর্যায়ে কর্মকান্ড জোরদার করতে হবে। যেহেতু এখনো গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে, তাই সুগন্ধি আমন ধানের জমিতে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে সুগন্ধি ধানের থোড় বের হওয়ার আগে ও পরে মাত্রা মোতাবেক নির্দিষ্ট ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। ব্রিধান-৪৯-এ লক্ষিরগু রোগের প্রাদুর্ভাব হলে সেক্ষেত্রেও সঠিক মাত্রায় ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া আমন ধানের ক্ষেতে ইঁদুর দমনের জন্যও নিতে হবে  প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। আমন ধান কাটার পরই কৃষক ওই জমিতে বিভিন্ন শাকসবজি, ডাল, তেল, গম, আলু, ভুট্টা, আখ ও মসলাজাতীয় ফসলের চাষ করবেন। এসব ফসল চাষে কৃষকের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। কৃষক এই সময় যাতে সহজে কৃষিঋণ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। ৪ শতাংশ সরল সুদে আমদানিনির্ভর ফসল চাষের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ প্রদানের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নেও উদ্যোগ নিতে হবে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে। আমাদের কথা দেশের যেসব অঞ্চলে ডাল, তেল, ভুট্টা ও মসলাজাতীয় ফসলের চাষ বেশি হয়, সেসব এলাকার কৃষক যাতে ৪ শতাংশ সুদে কৃষিঋণ পান সে ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশে কৃষিকাজে প্রায় ৯৬ হাজার সেচযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। এসব সেচযন্ত্রের অধিকাংশেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় ডিজেল। সম্প্রতি ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফসলের জমিতে সেচ প্রদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন কৃষক। বোরো ও রবিশস্য চাষে সেচের কোনো বিকল্প নেই। তাই কৃষকদের সেচকাজে সহায়তা করার জন্য কমপক্ষে ৫০ ভাগ সেচযন্ত্র সোলার প্যানেলের মাধ্যমে চালানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। এতে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষিত হবে, অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে  প্রচুর আম উৎপাদিত হয়, সেখানে আম প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। মধুপুরে প্রচুর আনারস ও কাঁঠাল উৎপাদিত হয়, সেখানে আনারস ও কাঁঠাল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। বগুড়া ও যশোরে প্রচুর শাকসবজি উৎপাদিত হয়, সেখানে সবজি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করতে হবে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিমান ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরি স্থাপনসহ প্রয়োজীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত