ঢাকায় কালো ধোঁয়ায় দম বন্ধ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ০১:৫৫ এএম

দেশের মোটরযান অধ্যাদেশ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কোনো যানবাহন থেকে স্বাস্থ্যের বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হলে তা জরিমানাসহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে চলা যান জব্দ করতে নির্দেশনা রয়েছে উচ্চ আদালতের। তবে এসব অধ্যাদেশ-আইন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাস্তবে খুব একটা প্রতিপালন নেই। আর এই সুযোগে রাজধানীতে কালো ধোঁয়া নির্গত করা ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একইসঙ্গে নতুন করে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বাসগুলো।

এসব বাসের জন্য নাকাল হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি তৈরি করা চলন্ত এসব বাস অনেক সময় পেছনে থাকা অন্য যানবাহনের দুর্ঘটনায় পড়ার কারণ হয়েও দাঁড়াচ্ছে। তবে এতকিছুর পরও ফিটনেসবিহীন এসব বাসের রাস্তায় নামা ঠেকাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) খুব একটা সরব ভূমিকা নেই। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিআরটিএ’র তদারকির অভাবে কালো ধোঁয়া নির্গত করা ফিটনেসবিহীন বাসগুলো রাস্তায় চলতে পারছে।

মূলত ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকেই কালো ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। কালো ধোঁয়ার বেশির ভাগই আসে সড়কে চলা লক্কড়-ঝক্কড় বাস থেকে। যানবাহনের কালো ধোঁয়ার মধ্যে থাকে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্রোমিয়াম ও সিসার মতো ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান। যার কারণে মানবদেহে শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণ, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি ও মস্তিষ্কের নানা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সদরঘাট, গুলিস্তান, রামপুরা, বাড্ডা ও শাহবাগসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চলতি মাসেই ঘটা করে জাতীয় নিরপদ সড়ক দিবস পালন করা হলেও রাস্তায় এখনো অহরহ চলছে কালো ধোঁয়া ছাড়া ফিটনেসবিহীন বাস। এসব বাস দিনের বেলায়ও সড়ক দাপিয়ে বেড়ায়। এই নৈরাজ্য যেন দেখেও দেখার কেউ নেই।

নীলফামারীর বাসিন্দা অর্জুন রায় পেশায় শিক্ষক। গতকাল একদিনের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন ব্যক্তিগত কাজে। রাজধানীতে চলাচল করা বাসগুলোর দুরবস্থায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী থেকে গাবতলী রুটের ৮ নম্বর বাসে উঠলাম। এই বাসের যে করুণ অবস্থা! ভালোভাবে বসাও যায় না। তার ওপর আবার যে পরিমাণ কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। এর থেকে আমাদের জেলা শহরের বাস অনেক ভালো। ঢাকায় মানুষ কীভাবে এসব বাসে যাতায়াত করে?’

ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয় শাহবাগের একটি বাস স্টপেজের সামনে। তিনি বলেন, ‘একটি ডিজিটাল শহরে এসব লক্কড়-ঝক্কড় বাস কীভাবে চলে। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো কিছু অভিযান দেখা যায়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এসব কালো ধোঁয়া ছাড়া বাস কীভাবে সড়কে চলাচল করে! বিআরটিএ কি এগুলো দেখে না?’

লক্কড়-ঝক্কড় বাস নিয়ে রাস্তায় নামার কারণ জানতে চাইলে সদরঘাট থেকে মিরপুর রুটে চলাচল করা বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসের কর্মী মো. সফিউল ইসলাম বলেন, ‘বাসের যে খারাপ অবস্থা তা মালিককে বলা হয়। কিন্তু আগের মতো পরিবহনের সেইরকম ব্যবসা নাই। এখন বাসের মালিক যদি বাস ঠিক না করে তাহলে আমরা কী করব? আমাদের তো বাস নিয়ে রাস্তায় না নামলে পেটে ভাত যাবে না।’

সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়ন ইস্যুতে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের দাবি, রাজধানী ঢাকায় যেসব বাস চলাচল করে তার অধিকাংশিই ফিটনেসবিহীন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটিতে যেসব বাস চলে তার বেশিরভাগই ফিটনেসবিহীন। তার জন্যই এসব বাস থেকে কালো ধোঁয়া বের হয়। যার জন্য মাঝেমধ্যেই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সরকারের উচিত এসব ফিটনেসবিহীন বাস সড়ক থেকে দ্রুত অপসারণ করা।’

সরকার সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন করলেও সড়কে চলা বাসের মানোন্নয়নে নজর দিচ্ছে না বলে মনে করছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। আগের থেকে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। যোগাযোগে নতুন বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু সড়কে যে বাস চলছে এগুলো দেখলে মনে হয় আমরা গরিব দেশে বসবাস করছি। সরকার সড়ক ব্যবস্থাকে উন্নত করলেও বাসগুলোর দিকে সেভাবে নজর দিচ্ছে না। যার জন্য বছরের পর বছর ধরে কালো ধোঁয়া ছাড়া ফিটনেসবিহীন বাস সড়কে চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সাধারণ যাত্রীরা একদিকে বাসে বসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। আবার সড়কে কালো ধোঁয়া ছাড়া বাসের জন্য অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে নগরজীবন। এসব বাস অপসারণ করে সড়কে ভালোমানের বাস নামানো দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।’

রাজধানীতে নতুন করে বায়ুদূষণের জন্য ফিটনেসবিহীন বাসগুলো দায়ী বলে জানান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কে চলা বাসগুলোর মানে পরিবর্তন আনা উচিত। যে বাসগুলো চলে তার অধিকাংশই লক্কড়-ঝক্কড়। ঢাকা শহরে যে সিটি বাসগুলো আছে তার ৭০ শতাংশের ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের (বড় ধরনের মেরামত) মতো পরিস্থিতি নেই। অধিকাংশ বাসের ইকোনমিক লাইফ শেষ হয়ে গেছে। তাই পুরনো লক্কড়-ঝক্কড় বাস সরিয়ে নতুন বাস নামানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পাশপাশি এখন থেকেই পরিবেশের দিক বিবেচনা করে ইলেকট্রিক বাস নামানোর পরিকল্পনা করা উচিত।’

অধ্যাদেশ-আইন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ভেঙে রাজধানীর সড়কে ফিটনেসবিহীন বাস চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ উপপরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. হেমায়েত উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়ক আইন সবাইকে মানতে হবে। আমরা সবসময় চেষ্টা করি সড়কে শৃঙ্খলা আনতে। যেসব ফিটনেসবিহীন বাস চলে সেগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান আছে। এমনকি ছুটির দিনেও আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা হচ্ছে। যে সব বাস সড়ক পরিবহন আইনের ব্যত্যয় ঘটায় সেগুলোকে জরিমানা করা হচ্ছে। তবে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হলে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। মালিকদেরও বুঝা উচিত, দেশে কেমন গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকা উচিত। তাহলেই সব সমাধান হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত