বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তেল-গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ার পেছনে রাজনীতি আছে

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ১১:৩৫ এএম

ড. ম তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের ডিন, পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী। সম্প্রতি দেশে গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের মধ্যেই গ্যাস সংকটে অতিষ্ঠ জনজীবন। পরিস্থিতি এমন যে রাজধানীবাসীর রান্নার রুটিনই চেঞ্জ হয়ে গেছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটে দেশজুড়ে শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে ক্ষোভ বাড়ছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. ম তামিম : বিষয়টা তো সবার জানা। গ্যাস নেই, গ্যাস কিনতেও পারছে না। মূল সমস্যা হচ্ছে পয়সা নেই, গ্যাস কেনা যাচ্ছে না। নিজস্ব গ্যাসের সরবরাহ নেই। এই মুহূর্তে কিছু করারও নেই, এটা যেভাবে আছে আপাতত সেভাবেই চলবে। শীতকালে তো নরমালি আমাদের আবাসিক এবং শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। তবে শীতে বিদ্যুতের পরিস্থিতি অত খারাপ থাকবে না। গত দুই/তিনদিনে একটু ঠান্ডা পড়াতে বিদ্যুতের পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হয়েছে, লোডশেডিং খুবই কম হয়েছে। তো বিদ্যুৎ ঠিক থাকবে কিন্তু শীতকালে আবাসিক এবং কলকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ কমবে। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি দাম কমে এবং যদি সরকার এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করা যাবে। তবে আমি আগামী গরমকালের আগে এটার সম্ভাবনা খুব কম দেখছি।

দেশ রূপান্তর : উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে শিল্পকারখানা অধ্যুষিত এলাকায় গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং লোডশেডিং কম করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিল্প মালিক। লোডশেডিংয়ের আগাম তথ্য জানানোর কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

ড. ম তামিম : এটা করা খুব মুশকিল। দিতে হলে তো সব জায়গাতে দিতে হবে, আমাদের তো স্পেসিফিকলি শিল্প এলাকা বলে কিছু নেই। তবে বেশি শিল্প অধ্যুষিত এলাকা হলে সেখানে দেওয়া যেতে পারে। তাতে আবার দেশের অন্যান্য স্থানে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় যেসব শিল্প আছে তাদের আবার গ্যাস সরবরাহ কমে যাবে। আমরা যদি একটা জোন করতে পারতাম, যেটা এখন করা হচ্ছে। ইকোনমিক জোনগুলোর মধ্যে যদি শিল্পকে নেওয়া যেত, আমাদের শিল্পের প্রসারটা যদি স্পেসিফিক জায়গায় হতো, যেটা পৃথিবীর সব দেশেই হয়। সব দেশে শিল্প এলাকাটা ভিন্ন থাকে, সেখানে আবাসিক এলাকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বা বেকারির বড় কারখানা থাকে না। আমাদের জন্য আসলে এক্সক্লুসিভলি শিল্পকে যে আলাদাভাবে গ্যাস সরবরাহ করবে, টেকনিক্যালি এটা খুবই কঠিন।

আর লোডশেডিংয়ের আগাম তথ্য দিতে পারছে না কারণ প্রথমত যারা লোডশেডিং করে, শিডিউলটা যারা দিচ্ছে, তারা হলো ডিস্ট্রিবিউটর। তারা আগের দিনের সরবরাহ এবং প্রতিশ্রুতি, মানে আগামীকাল তোমাদের এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দেওয়া হবে এর ভিত্তিতে তারা একটা শিডিউল করছে। কিন্তু আসলে দেখা যাচ্ছে, তাদের যারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে তারা কম দিচ্ছে। সেজন্য তাদের শিডিউলের বাইরে অনির্ধারিতভাবে লোডশেডিং হচ্ছে। 

দেশ রূপান্তর : জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দেশকে চরম সংকটের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিমালা অনুসরণ করা হলো না কেন?

ড. ম তামিম : ১৯৯৯ সালের পর থেকে সত্যিকার অর্থে দেশে কোনো তেল-গ্যাস অনুসন্ধান হয়নি। আজ প্রায় ২২ বছর হয়ে গেল। যে দু-চারটি অনুসন্ধান হয়েছে, কূপ খনন হয়েছে সেগুলো খুবই নগণ্য। ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ¦ালানি নীতির মূল লক্ষ্য ছিল কয়লা উত্তোলন করা। কয়লা উত্তোলন করা হয়নি, কারণ গ্যাস দিয়ে আমাদের তখন চলছিল। পরবর্তী সময়ে গ্যাসের যখন ঘাটতি দেখা দিল তখন কথা উঠল। বিশেষ করে এশিয়া এনার্জি যখন কয়লা উত্তোলন ও স্টোরেজের কথা উঠাল। আমাদের দেশে কয়লার তেমন ব্যবহার ছিল না, সে কারণেই তারা কয়লা স্টোরেজের কথা বলেছিল। পরবর্তী সময়ে তারা কয়লার এক্সপোর্ট থেকে সরে এসে বলেছে, তোমরা যদি কয়লা ব্যবহার করো তোমাদের কাছেই কয়লা বিক্রি করব, যদি পুরোটা নিতে পার তাহলে সবটুকুই নেবে; সেটা না হলে তারা রপ্তানির কথা বলেছে। তবে কয়লার একটা পরিবেশগত রিস্ক আছে। বিদেশি কোম্পানিরা বলেছে এই এনভায়রনমেন্টাল রিস্কটা কঠিন কিছু না। এর ইঞ্জিনিয়ারিং সলিউশন আছে, আমরা এটা ম্যানেজ করতে পারব। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সেটা কখনোই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। আগের মানে ২০০১ থেকে ২০০৬ যে সরকার ছিল তারা চেষ্টা করেছিল, তখন আন্দোলন হওয়ায় সেটা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর তো ২০১০ বা ২০১১ সালে সরকার ঘোষণা দিল যে কয়লা আমরা উত্তোলন করব না। এরপর থেকে তো কয়লা উত্তোলন বন্ধ হয়ে আছে। আমি মনে করি কয়লা উত্তোলন বন্ধ হওয়ার মূল কারণটা হলো রাজনীতি। অর্থনীতিও আছে। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান যে হয়নি, এর পেছনেও কিছুটা হলেও রাজনীতি আছে। এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার আছে। একটা রাজনৈতিক মহল যাদের জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই কিন্তু মিশন চালু আছে, তেল-গ্যাসের ক্ষেত্রেও তারা বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা করেছে। তো তাদের বিরোধিতার কারণেই ১৯৯৯ সালের পর থেকে দেশে আর কোনো বিদেশি কোম্পানি আসেনি। দুই একটা এলেও কাজ করতে পারেনি। অর্থাৎ বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। সরকার তাদের জন্য সহায়ক হয়নি, আর সেই নীতিও গ্রহণ করেনি। যে কারণে নিজস্ব অনুসন্ধান, উৎপাদন, তা কয়লা হোক বা গ্যাস, কোনোটাই আগায়নি। আমরা বেশি মাত্রায় আমদানিনির্ভর হয়ে গেলাম। ঝুঁকি তৈরি করলাম এবং এখন আমরা তার মধ্যে পড়ে গেলাম।

দেশ রূপান্তর : ভোলায় গ্যাস পড়ে আছে, করণীয় কী?

ড. ম তামিম : ভোলায় যে গ্যাস তার তো মজুদের নির্ণয় ঠিকমতো করা হয়নি। পেট্রোবাংলা বা বাপেক্স তারা যে গ্যারান্টি দিয়ে বলবে যে এখানে এতটুকু মজুদ আছে প্রথমত তারা কিছুই বলেনি। দ্বিতীয়ত, একটা মিনিমাম মজুদ না থাকলে কোনো প্রকল্পের জন্য তো গ্যাস তোলা যাবে না। তারপরও ভোলার গ্যাস তো পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রকল্পে ব্যবহার হচ্ছে। তো এটা যদি এখন এক/দুই টিসিএফ না হয় তাহলে তো কোনো প্রকল্পেই কাজে দেবে না। প্রকল্পের পুরো যে পরিকল্পনা আছে, তাতে কত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কত বছরের জন্য সরবরাহ করলে সেই বিনিয়োগ লাভজনক হবে এগুলো তো হিসাব-নিকাশের ব্যাপার, তাই না? বললেই তো হবে না যে দুই মাসের মধ্যে আমরা ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নিয়ে আসব। সেটা আমরা কোথায়, কীভাবে ব্যবহার করব? বলা হচ্ছে, শিল্প মালিকরা সেখানে গিয়ে সিএনজির মাধ্যমে গ্যাস নিয়ে আসবে। কিন্তু, অলরেডি তারা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। যেই পরিমাণ শিল্প আছে বাংলাদেশে তাতে ওই ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কোথায় রাখবে আর কোথা থেকে সে তা সিএনজি করে নিয়ে যাবে মানে এটা অবাস্তব চিন্তাভাবনা। ওই ৮০ মিলিয়ন গ্যাস যদি এখন পাইপলাইনে নিতে পারে সেটা ঠিক আছে।

দেশ রূপান্তর : বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে, এর ইম্প্যাক্ট কী?

ড. ম তামিম : এই নীতি যখন সরকার নিয়েছে সেটা ঠিক ছিল এবং আমি মনে করি সেটা এখনো ঠিক আছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এটা আরও প্রসারণ করা দরকার। আমাদের দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে, আরও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এগুলো সময় সাপেক্ষ, এগুলো প্যারালালি চালিয়ে যেতে হবে। এগুলো দীর্ঘদিন না করে বসে থাকা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। কিন্তু আমদানিও আমাদের করতে হবে। আমদানির ফ্যাসিলিটিজও বাড়াতে হবে। আমাদের যে পরিমাণ গ্যাস লাগে তা আমরা এখন চাইলেও আনতে পারছি না, তার কারণ হলো আমরা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাইনি। অর্ধেক করলাম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, আর অর্ধেক করলাম স্পটের চুক্তি। এখন স্পটে আমরা ৩ ডলারে গ্যাস কিনি, আবার ৫০ ডলারেও কিনতে হয়। স্পট থেকে গ্যাস কিনতে প্রথমত সক্ষমতা, দ্বিতীয়ত পারপাসটা ক্লিয়ার থাকতে হবে। ইমার্জেন্সি পিক লোডের জন্য স্পট থেকে গ্যাস কিনতে যাব। যে কোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। ফলে তার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে আমি স্পট থেকে কিনতে থাকব, এটা সম্পূর্ণ ভুল। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাড়াতে হবে। দশ থেকে পনেরো পার্সেন্ট ক্যাপাসিটি স্পট থেকে নিতে পারি, দাম বেশি হলে কিনব না।

দেশ রূপান্তর : এই মুহূর্তে গ্যাস সংকটের স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী?

ড. ম তামিম : পেট্রোবাংলা বলেছে যে তারা আগামী ২৫ সালের মধ্যে বর্তমানে যে ক্ষেত্রগুলো আছে, সেগুলো থেকে ৬০০ মিলিয়ন অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করবে। আমি মনে করি না যে তারা এটা করতে পারবে। তাদের যে অতীত ইতিহাস, তাতে এই তিন বছরে এই পরিমাণ গ্যাস উৎপাদনের ক্ষমতা এককভাবে পেট্রোবাংলার নেই। এই পরিকল্পনা তারা দিয়েছে আইওয়াশের জন্য। করতে হলে তাদের তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নিতে হবে। এটা করার জন্য যে টেকনোলজি ও জ্ঞানের দরকার সেটা আমাদের দেশে নেই। দুঃখজনক হলেও দীর্ঘদিন আমরা এই সেক্টরে কাজ করছি কিন্তু সেই জ্ঞান আমাদের এখানে কারোর নেই। এই জ্ঞানটা আহরণ করতে হবে। কোথায় কী করা যেতে পারে এবং বর্তমানের গ্যাসক্ষেত্রগুলো নিয়ে আরও বিপুল স্টাডি করে পরিকল্পনা নিতে হবে। এখানে অর্থায়নেরও ব্যাপার আছে। ডলারের এখন যে অভাব, তাতে আমরা কেন একটা রিস্কের মধ্যে দেশীয় ডলার ইনভেস্ট করতে যাব! আমি মনে করি ফরেন ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে এখান থেকে ডলারের রিস্কটা সরিয়ে নিতে হবে। পুরো ইনভেস্টমেন্টটা তারা করবে, যদি গ্যাস পায় তাহলে সেটা আমরা কিনে নেব, ইনভেস্টমেন্টের পয়সা দেব। জ¦ালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া আমাদের উপায় নেই। পাশাপাশি নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আমদানির ঝুঁকি কমিয়ে আনা যায়। যত সময় লাগুক, গ্যাস অনুসন্ধান করতেই হবে। একক জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করা যাবে না। সবার মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত জ্বালানিনীতি তৈরি করে এগোনো দরকার এখন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত