‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু...’

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ১১:০১ পিএম

‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো/ তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই লাইন দুটি ঢাকাবাসীর মর্মে এসে আঘাত করে। কারণ ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিগত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রথম দিকেই রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর পাঁচটি মহানগরের একটি। ঢাকা কয়েক বছর ধরেই এই অবস্থানে রয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে ঢাকার বায়ু বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২০০ দিনের চেয়েও বেশি সময়জুড়ে অনিরাপদ বা অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় দেখা গেছে। অন্যদিকে বিশ্বের বড় বড় শহরের প্রতিদিনের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের তথ্য মতে, রবিবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা ৬ নম্বর অবস্থানে রয়েছে। আগস্টে ছিল ৪ নম্বরে এবং সেপ্টেম্বরে ছিল ১ নম্বর অবস্থানে। দূষিত বায়ুর মহানগরের তালিকায় দিল্লির পরেই ধারাবাহিকভাবে রয়েছে ঢাকার নাম। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে ঢাকায় গড় বায়ুদূষণের পরিমাণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। গাড়ির কালো ধোঁয়া, অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজ এই দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে মনে করছেন গবেষকরা।

গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘ঢাকায় কালো ধোঁয়ায় দম বন্ধ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীতে কালো ধোঁয়া নির্গত করা ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ এই বাসগুলো। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান জানান, রাজধানীতে বায়ুদূষণের জন্য ফিটনেসবিহীন বাসগুলো দায়ী। দেশের মোটরযান অধ্যাদেশ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কোনো যানবাহন থেকে স্বাস্থ্যের বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হলে তা জরিমানাসহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে চলা যান জব্দ করতে নির্দেশনা রয়েছে উচ্চ আদালতের। তবে এসব অধ্যাদেশ-আইন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাস্তবে খুব একটা প্রতিপালন নেই। এসব বাসের জন্য নাকাল হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি তৈরি করা চলন্ত এসব বাস অনেক সময় পেছনে থাকা অন্য যানবাহনের দুর্ঘটনায় পড়ার কারণ হয়েও দাঁড়াচ্ছে। তবে এতকিছুর পরও ফিটনেসবিহীন এসব বাসের রাস্তায় নামা ঠেকাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) খুব একটা সরব ভূমিকা নেই। সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটিএ’র তদারকির অভাবে কালো ধোঁয়া নির্গত করা ফিটনেসবিহীন বাসগুলো রাস্তায় চলতে পারছে।

সরকার সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন করলেও সড়কে চলা বাসের মানোন্নয়নে নজর দিচ্ছে না। যার জন্য বছরের পর বছর ধরে কালো ধোঁয়া ছাড়া ফিটনেসবিহীন বাস সড়কে চলছে। সমীক্ষায় দেখা যায়,  ঢাকা শহরে যে সিটি বাসগুলো আছে তার ৭০ শতাংশের ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের (বড় ধরনের মেরামত) মতো পরিস্থিতিতে নেই। অধিকাংশ বাসের ইকোনমিক লাইফ শেষ হয়ে গেছে। বিআরটিএ, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও অন্যান্য তদারকি সংস্থা কী করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা তাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে পরিবহন মালিকদের পরিবেশ ও জনজীবনের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে এ বিষয়ে সচেতনতাও জরুরি। পুরনো লক্কড়-ঝক্কড় বাস সরিয়ে নতুন বাস নামানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পাশপাশি এখন থেকেই পরিবেশের দিক বিবেচনা করে ইলেকট্রিক বাস নামানোর পরিকল্পনা করা উচিত।

ঢাকা মহানগরীতে অব্যাহত পরিবেশ দূষণের ফলেই এখানকার বায়ুর মান ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স মনে করে, ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য ও টেকসই করতে বিকেন্দ্রীকরণ, উন্মুক্ত জায়গা দখলমুক্তকরণ, পার্ক বা উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা করা দরাকার। গ্রিন পিসের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বায়ুদূষণজনিত রোগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৯৬ হাজার শিশুর অকালমৃত্যু হয়েছে। বছরে ৪০ লাখ মানুষ অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসছে চিকিৎসা নিতে। এমন উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ বন্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়ররা নির্বিকার থাকতে পারেন না। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বায়ুদূষণ বন্ধে কেন জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত