রাজধানীর ধানমন্ডি লেকপাড়ে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদত হোসেন মজুমদার খুনের ঘটনা তদন্তে গিয়ে লেকপাড় এলাকার সবকটি সিসি (ক্লোজ সার্কিট) টিভির ডিভিআর (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার) ডিভাইস খুলে নিয়ে গেছে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। কবে নাগাদ এসব ডিভাইস ফেরত দেওয়া হবে তা জানেন না লেকের বিভিন্ন দোকানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্র্তৃপক্ষ। এতে পুরো লেকপাড় এলাকা হয়ে পড়েছে অরক্ষিত। সিসিটিভির ডিভিআর ডিভাইস কবে নাগাদ ফেরত দেওয়া হবে সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেয়নি পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে ফের কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে তার কোনো ভিডিও চিত্র পাবে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এদিকে গতকাল পর্যন্ত শাহাদত হোসেন খুনের কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনাটিকে ছিনতাই ধরেই তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে থানা পুলিশসহ অন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে মামলাটি তদন্তের মূল দায়িত্ব ধানমন্ডি থানা-পুলিশের। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার নেই বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
গত ২২ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর কলাবাগানের ১৯/নর্থ সার্কুলার রোড (চতুর্থ তলা) বাসা থেকে হাঁটাহাঁটির উদ্দেশ্যে বের হন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদত হোসেন। পরে রাত আড়াইটার দিকে ধানমন্ডি লেকের রবীন্দ্র সরোবর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে তিনটি চাকুর জখম ছিল। এ ঘটনার পরদিন শাহাদতের স্ত্রীর বড় ভাই শফিউল আজম চৌধুরী বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত পরিচয়ের ছিনতাইকারীদের আসামি করা হয়েছে।
ছিনতাই মামলা করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাদী শফিউল আজম বলেন, তার কোনো শত্রু ছিল না। ঘটনার আলামত দেখে ছিনতাই মনে হয়েছে। এজন্য ছিনতাই মামলা করা হয়েছে।
এদিকে এর আগেও ধানমন্ডি লেক এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৭ এপ্রিল রাত সোয়া ৮টার দিকে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে দুই শিক্ষার্থী আহত হন। গত বছরের ৩ জুন সন্ধ্যায় ধানমন্ডি লেকের রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় তিন শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইকারীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লেকের মোট ৬টি খাবারের দোকানের আশপাশে ১৬টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে লেকের দোকান ইজারাদার গোলাম রব্বানী হিরু। শাহাদত হোসেন হত্যা মামলার তদন্তে গিয়ে গত শুক্রবার সবকটি সিসিটিভির ডিভিআর ডিভাইস খুলে নিয়ে গেছে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। এরপর থেকে লেকের আর কোনো ফুটেজ ধারণ হচ্ছে না।
এ বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ওসি মো. ইকরাম আলী মিয়া গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্তের জন্য শুক্রবার সিসিটিভির ডিভাইস আনা হয়েছে। সেগুলো দ্রুতই ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’
এই সময়ে লেক পাড় অনিরাপদ কিনা জানতে চাইলে ডিএমপির রমনা বিভাগের ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মাসুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা দেখব।’ তিনি আরও বলেন, এখনো হত্যায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত চলমান আছে।
লেকের নিরাপত্তার বিষয়ে জানা গেছে, দোকান ইজারাদারদের নারী নিরাপত্তা প্রহরীরা সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত লেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে। এ ছাড়া পুলিশের একটি টিম সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রবীন্দ্র সরোবরের পাশে অবস্থান করে। রাতে লেকের ভেতর নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। লেকের পাশের সড়কে পুলিশ নিয়মিত টহল দেয়। পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরের বুলেট নামে এক ছিনতাইকারীর নেতৃত্বে অন্তত ১০ ছিনতাইকারী দাপিয়ে বেড়ায় ধানমন্ডি লেক ও এর আশপাশের এলাকায়। তারা মূলত চাকু নিয়ে ছিনতাই করে। শাহাদত হোসেন হত্যার ঘটনায় বুলেটকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় পরবর্তীকালে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ধানমন্ডি থানার ওসি। এদিকে লেকে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট। তারা মাঝেমধ্যেই দোকানি ও লেকে ঘুরতে আসা লোকজনের সঙ্গে বিবাদে জাড়িয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর লেকের পাড়ে কলাবাগান ক্লাবের পেছনে প্রকাশ্যে বসে মাদকের হাট। সেখান থেকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক কিনে সেগুলো অনেকে সেবন করে রবীন্দ্র সরবরের পেছনে বাগানবাড়ি ও জাহাজবাড়ির পাশে। রাত ১১টার পর লেক চলে যায় ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের নিয়ন্ত্রণে। এসময়ের পর ভয়ে স্থানীয়দের কেউ লেক এলাকায় প্রবেশ করেন না। লেকে দিনের বেলা ঢিলেঢালা নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও রাতে কার্যত নেই কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। দোকান ইজারাদাররা নিজ উদ্যোগে সিসিটিভির ব্যবস্থা করেছেন। তবে বিদ্যুৎ চলে গেলে তারও নেই কোনো বিকল্প ব্যবস্থা। সঙ্গে সাত নারী সদস্যও নিয়োগ দিয়েছে দোকান ইজারাদারেরা। তারা মূলত হকারদের লেক এলাকা থেকে বের করার কাজে ব্যস্ত থাকে।
গতকাল দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, লেকের ৮ ও ৯ নম্বর গেটের মধ্যে রবীন্দ্র সরোবরের যে স্থানে শাহাদত হোসেনের মরদেহ পড়ে ছিল সেই জায়গাটি সিসিটিভির আওতার বাইরে। তা ছাড়া ঘটনার সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ ছিল সিসিটিভি। দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লেকে ১৬টি সিসি ক্যামেরা থাকলেও ঘটনার দিন বিকেলে গাছের ঢাল ভেঙে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় ৭টি সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো ছিল।
লেকের নাজুক নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির রমনা বিভাগের ধানমন্ডি অঞ্চলের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. ইহসানুল ফিরদাউস দেশ রূপান্তরকে বলেন, সন্ধ্যার পর অন্তত ৫০ হাজার লোকের আনাগোনা থাকে লেক এলাকায়। একধরনের মেলা বসে সেখানে। দোকানপাট খোলা থাকে। তাদের মধ্যে কে অপরাধী তা আলাদা করার উপায় নেই। এ ছাড়া লেকের কোনো প্রাচীর নেই। যে কেউ যেকোনো সময় নিচু প্রাচীর টপকে ঢুকতে পারে। গেইটে কোনো এনট্রি রেসট্রিকশনের সুযোগ নেই। ফলে সেখানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়ার মতন পুলিশের জনবলও নেই। তিনি বলেন, এ এলাকার অন্তত ১০ জনের বেশি ছিনতাইকারীর তথ্য আমাদের কাছে আছে।
