সফররত কেনেডি জুনিয়র

একাত্তরে বাংলাদেশ বিষয়ে ভুল পক্ষ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২২, ০৭:০১ এএম

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভুল পক্ষ নিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রয়াত সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডির ছেলে এডওয়ার্ড টেড এম কেনেডি জুনিয়র। গতকাল রবিবার দুপুরে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয় পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে এমন কথা বলেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আট দিনের সফরে গত শনিবার বাংলাদেশে এসেছেন টেড এম কেনেডি জুনিয়র।

তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সালে আমার বাবা বাংলাদেশে এসেছিলেন। ঢাকায় তাকে দারুণভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা তিনি আমাদের বলেছিলেন। তার পরিবারের সদস্য হিসেবে এখানে আসতে পেরে আমরা গর্বিত।’

কেনেডি জুনিয়র আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাবা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র ভুল পক্ষ নিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় আমরা খুবই খুশি।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল যখন যুক্তরাষ্ট্র সরকার, সে সময় মুক্তিকামী বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দেশটির সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে মতামত তৈরিতে কাজ করেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ সফরের প্রথম দিনেই রিকশায় করে সপরিবারে পুরান ঢাকা ঘুরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ভাতিজা এডওয়ার্ড এম কেনেডি জুনিয়র। গতকাল ঢাকায় দেশটির দূতাবাস তাদের ফেইসবুক পেজে কেনেডি পরিবারের সদস্যদের পুরান ঢাকায় বেড়ানোর ছবি শেয়ার করেছে। এ ছাড়া গতকাল সকালে এম কেনেডি জুনিয়র এবং তার পরিবারের তিন সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আট দিনের সফরে তারা দেশের বেশ কয়েকটি স্থান পরিদর্শন করবেন।

আগামী ৫ নভেম্বর এম কেনেডি জুনিয়র তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করবেন। কেনেডি জুনিয়রের সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তার স্ত্রী ড. ক্যাথরিন কিকি কেনেডি, মেয়ে ড. কাইলি কেনেডি, ছেলে টেডি কেনেডি, ভাতিজি গ্রেস কেনেডি অ্যালেন এবং ভাতিজা ম্যাক্স অ্যালেন।

গতকাল এডওয়ার্ড এম কেনেডি জুনিয়র ও তার পরিবারকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ফেইসবুক পোস্টে বলা হয়েছে, সফরের প্রথম দিনেই তারা রিকশায় করে পুরান ঢাকার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি প্রত্যক্ষ করেন এবং ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লায় যাত্রাবিরতি নেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কেনেডি পরিবারের সম্মানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন একটি ভোজের আয়োজন করছেন। তারা সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এ ছাড়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত শিক্ষা বিনিময় কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পিকারস প্রোগ্রামের পৃষ্ঠপোষকতায় জুনিয়র এডওয়ার্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও বক্তৃতা দেবেন। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের একজন সমর্থক হিসেবে তার পিতার ভূমিকার কথা তুলে ধরবেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ সাবেক সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির রোপণ করা বটগাছটিও পরিদর্শন করবেন তিনি। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা এ আইনজীবী ঢাকার এডওয়ার্ড এম কেনেডি সেন্টার ফর পাবলিক সার্ভিস অ্যান্ড দ্য আর্টসে প্রতিবন্ধী অধিকারের ওপরও একটি বক্তৃতা দেবেন। বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন কেনেডি পরিবারের সদস্যরা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানকে মদদ দেন। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জোরালো সমর্থন ছিল সিনেটর হিসেবে পরিচিত এডওয়ার্ড এম কেনেডির। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্য সফরে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পাকিস্তানি বাহিনী যে সাম্প্রতিক মানব ইতিহাসের ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছিল, সে সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে সিনেটে ‘দক্ষিণ এশিয়ার সংকট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেদনে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনী আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানবিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানি বাহিনী ২৫ মার্চ রাতে পরিকল্পিতভাবে চরম আতঙ্কের বিস্তার ঘটিয়েছিল এবং গণহত্যা চালিয়েছিল, যার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দুই মাস পরই ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ : এম কেনেডি জুনিয়র ও তার পরিবারের তিন সদস্য গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) সমর্থনে প্রয়াত সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডির অসামান্য অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, শেখ হাসিনা এম কেনেডি জুনিয়র, তার ছেলে, মেয়ে এবং স্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেনেডি সিনিয়রের বাংলাদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী কেনেডি সিনিয়রকে ‘বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু’ বলেও অভিহিত করেন। সে সঙ্গে বাংলাদেশিদের ওপর গণহত্যার বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থানের কথাও স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিনেটর এম কেনেডি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রে তার কণ্ঠস্বর তুলে ধরেন এবং জনমত গড়ে তোলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত