ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে দালালদের ৭ লাখ টাকা দিয়ে দুবাইয়ের বিমান ধরেন একসময়ের সৌদিপ্রবাসী শফিউল ইসলাম। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে দুবাই, সিরিয়া হয়ে পৌঁছান লিবিয়ার মিসরাত শহরের একটি বাসায়। মাঝপথে অনাহারে কাটলেও মিসরাতের বাসাটি যে টর্চার সেল সেটি স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি। একটি ফ্ল্যাটের ছোট ছোট রুমে রাখা হয় তার মতোই ইতালিগামী ৪২ জনকে। কিছু সময় পরপর একেকজনের ডাক পড়তে থাকে টর্চার সেলে। সেখান থেকে ভেসে আসতে থাকে চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডাক পড়ে শফিউলেরও। টর্চার সেলে ঢুকতেই শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। চড়-লাথি-কিল-ঘুসিতে মিলিয়ে যায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন।
ততক্ষণে শফিউল বুঝতে পারেন পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েছেন তিনি। মার খেয়ে কান্না করলে নির্যাতন বেড়ে যেত কয়েকগুণ। একপর্যায়ে গ্রামের বাড়িতে ফোন করে ৫ লাখ টাকা পাঠাতে বলে টর্চার সেলের সদস্যরা। জোর করে নেয় পরিবারের সদস্যদের নাম্বারও। কিন্তু পরিবারের কাছে টাকা না চাওয়ায় দেওয়া হয় ইলেকট্রিক শক। চুল ধরে দেয়ালে আঘাত করা হয়। এভাবে টর্চার সেলের তিনজন নির্যাতন করতে থাকে প্রতিদিন। এরই মধ্যে চক্রের সদস্যরা নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারকে দ্রুত টাকা পাঠাতে বলে। না হলে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দিতে থাকে। যাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়, তাদের জোর করে ধরে নিয়ে যায় অন্য একটি চক্রের সদস্যরা। অনেকের কপালে কী জোটে, সেটি হয়তো জানে না কেউ।
লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ভিকটিম শফিউল গতকাল মঙ্গলবার টর্চার সেলের নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। শুধু শফিউল নন, লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে ইতালিগামীদের সবার কপালেই জোটে টর্চার সেলের ভয়ংকর নির্যাতন। বিক্রি হওয়ার পর অনেককে চিরকালের জন্য দাসত্ব বরণ করে নিতে হয়। শফিউলকেও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল ১০ লাখ টাকায়। কিন্তু তাকে হস্তান্তরের আগেই মানব পাচারকারী
চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে শফিউলকে দেশে ফেরত পাঠাতে বাধ্য করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ।
গ্রেপ্তাররা হলো বাদশা ও তার চাচাতো ভাই রাজিব মোল্লা। গত শুক্রবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে ডিবির মোহাম্মদপুর জোনাল টিম। ডিবি বলছে, এ চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তার হওয়া বাদশার বোনজামাই সুলতান ৯ বছর ধরে লিবিয়ায় অবস্থান করছে। তাদের এই শালা-দুলাভাই চক্র পাঁচ শতাধিক লোককে লিবিয়ায় পাচার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই টাকা দিয়ে আলিশান বাড়ি ও বিলাসবহুল গাড়িও কিনেছে তারা।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ বলেন, আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রের সদস্য বাদশা ও রাজিব দেশের বেকার যুবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ইতালি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় পাচার করে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির মোহাম্মদপুর জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. আনিচ উদ্দীন বলেন, গত ২৭ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী থানায় মানব পাচার আইনে হওয়া একটি মামলার সূত্র ধরে দুজনকে গ্রেপ্তার ও ভিকটিমকে ফেরত আনা হয়েছে। এ চক্রের মাধ্যমে পাচার হওয়া আরও ১৯ জনের তথ্য যাচাই-বাছাই করে বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কাজ করছে ডিবি।
পাচারের শিকার পিরোজপুরের নাজিরপুরের বাসিন্দা শফিউল বলেন, ‘ছয় বছর সৌদি আরব ছিলাম। সেখানকার এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারি মাদারীপুরের বাদশার মাধ্যমে ইতালি যাওয়া যায়। পরে গত ২৪ মে দেশে ফিরে বাদশার সঙ্গে দেখা করে ১৩ লাখ টাকায় দুবাই, সিরিয়া ও লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার চুক্তি হয়। ৭ রাখ টাকা অগ্রিম নেয়। তাদের কথা অনুযায়ী ৪ অক্টোবর দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা হই। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কুমিল্লা-বিক্রমপুর-চট্টগ্রাম থেকে আসা আরও ছয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। সবাই বাদশা ও রাজিবের মাধ্যমে ইতালি যাচ্ছিল। দুবাইয়ে ১১ দিন রাখা হয়। সেখান থেকে আমাদের ২০ জনকে বিমানে সিরিয়া নেওয়া হয়। সিরিয়াতে এ চক্রের পাঠানো ৪২ জন মিলিত হই। এরপর থেকে আর আমাদের খাবার দেওয়া হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘ওয়াশরুমের ট্যাবের পানি খেয়ে বিমানবন্দরে তিন দিন কাটিয়েছি। পরে আমাদের লিবিয়ার বেনগাজি নিয়ে দুই ঘণ্টা রাখার পর মিসরাতের টর্চার সেলে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়।’ ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে আর কেউ যাতে নিজের জীবন ও পরিবারকে বেকায়দায় না ফেলে সেই অনুরোধ করেন শফিউল।
স্বামীকে জীবিত ফেরত পাওয়ার আনন্দে পাশেই চোখের জল ফেলতে থাকা শফিউলের স্ত্রী সুমনা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী ফেরত এসেছে। কিন্তু অনেকে সবকিছু বিক্রি করে টাকা পাঠানোর পরও স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে। আর কেউ যেন এমন ফাঁদে পা না দেয়।’
