ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যে ছাত্র সংসদগুলো দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে এগিয়ে নিতে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছিল, যে ছাত্র সংসদগুলো স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সামরিক শাসন থেকে দেশকে গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে নিজেদের নিয়োজিত করেছিল; সেসব ছাত্র সংসদ গণতান্ত্রিক শাসনামলে বিলুপ্ত হয়ে গেল! নব্বইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে আবার ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল দীর্ঘ ২৯ বছর পর ২০১৯ সালের ২২ মার্চ। তখন ডাকসু নির্বাচনকে বাৎসরিক ‘ক্যালেন্ডার ইভেন্ট’ হিসেবে চালু রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর পার হয়ে গেছে আরও তিনটি বছর। কিন্তু নতুন নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। ছাত্রনেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা আবারও হয়তো দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হবে ডাকসু নির্বাচন। অথচ, ওই ডাকসু নির্বাচন আশা জুগিয়েছিল যে, এর ধারাবাহিকতা যেমন বজায় থাকবে তেমনি অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষার কলেজগুলোতেও নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সংস্কৃতি ফিরে আসবে। কিন্তু সেসবের কিছুই হয়নি। প্রায় তিন দশক পর ধূমকেতুর মতো হাজির হওয়া ডাকসু নির্বাচন আবার যেন ডুমুরের ফুল হতে চলেছে।
নব্বই পরবর্তী জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তন যেভাবে ছাত্ররাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে আর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে তাতে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, সরকার সমর্থকদের সমর্থনের অভাব ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন বন্ধ করার অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু খেয়াল করা দরকার, তিন বছর আগের সর্বশেষ নির্বাচনে ডাকসুর ২৫ পদের ২৩টিতেই জয় পায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। শুধু ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে জয় পায় ছাত্র অধিকার পরিষদ। অবশ্য সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে ক্ষমতাসীনদের অনুগত ছাত্রলীগ থাকার পরও কেন ওই ডাকসু সত্যিকার অর্থে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারল না সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এখানেই ছাত্র সংসদ তথা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের অনুপস্থিতি আর ছাত্ররাজনীতিতে সন্ত্রাস-দখলদারত্বের প্রশ্নটা সামনে চলে আসে। ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ডাকসু। সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ছাত্রদের দাবি আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে। করোনাপরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতি এবং কর্মচারী সমিতিগুলোর সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
খেয়াল করা দরকার, ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, আমরা সুন্দর পরিবেশে সময়মতো ডাকসু নির্বাচনের আয়োজন করব। তার আগে আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উন্নতি করা দরকার। উপাচার্য হিসেবে তার এই জবাবদিহি থাকা জরুরি যে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উন্নতি কল্পে তিনি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এবং হলগুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের একাধিপত্য বন্ধ করা এবং সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক তৎপরতায় সব মত-পথের ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই বা তার পদক্ষেপ কী? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন শিক্ষকরাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তখন ছাত্ররাজনীতিতে গণতান্ত্রিকতা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব কাজই বটে। ডাকসু-ই হোক কিংবা অন্য কোনো ছাত্র সংসদের নির্বাচন সেটা নিশ্চিত করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই কর্তব্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি সেই কর্তব্য পালনে বিরত থাকেন তাহলে এটা বলাই শ্রেয় যে, তারা হয় দায়িত্ব পালনে অক্ষম নয় ক্ষমতার রাজনীতির লেজুড়বৃত্তিতে নিয়োজিত। যে ছাত্ররাজনীতির সুষ্ঠু বিকাশের স্বার্থে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি তোলা হচ্ছে সেই ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ ছাত্ররাজনীতি পুরনো বৃত্তেই আটকে আছে। এই বৃত্ত প্রধানত জাতীয় রাজনীতির বড় দলগুলোর সঙ্গে লেজুড়বৃত্তির। ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের। তা সেটা ক্ষমতাসীন দলেরই হোক কিংবা বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের। আর এ কারণে সমস্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় ছাত্র সংগঠনগুলোর ‘স্বাধীনভাবে’ চিন্তা করতে না পারা আর ‘মূল দলের’ স্বার্থরক্ষার রাজনীতিতে নিয়োজিত থাকা। মূলত এ কারণেই সব শাসনামলেই ক্ষমতাসীনদের সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠন আর বিরোধী দলের সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলো নিজ নিজ দলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়। এই চর্চার কারণে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনেও গণতান্ত্রিক চর্চা পিছু হটে। আমরা আশা করব ছাত্র সংগঠনগুলো এই বৃত্ত ভেঙে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে পরিচালিত হবে। আশা করব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অবিলম্বে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে এমন চর্চাকে উৎসাহিত করবে।
