বাংলাদেশের বনজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে বনশিল্প উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বনশিল্প করপোরেশন, যা এখন বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন। এই করপোরেশনের ভিশন হলো রাবার, কাঠ ও কাঠশিল্পকে টেকসই ও উন্নত করা। ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে বনজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার; অপেক্ষাকৃত কম উর্বর ক্ষয়প্রাপ্ত পাহাড়, টিলা, উঁচুভূমিতে সফল টেকসই ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক রাবার বাগান সৃজন এবং মাটির ক্ষয়রোধ; প্রত্যন্ত জনপদে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন; কার্বন শোষণের মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাস এবং প্রাকৃতিক কাঁচা রাবার উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা। বিগত ছয় দশকের বেশি যাত্রায় করপোরেশনটি নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে তার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন জরুরি। বাস্তবতা হলো, যাই বলা হোক না কেন বাস্তবিক অর্থে তাদের সাফল্য এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘রাবার বাগান এখন বুড়ো হাতি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই করপোরেশনের রাবার চাষের একটা দুরবস্থার হতাশাজনক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ক্রমাগত লোকসান গুনছে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় করপোরেশনের শাহজীবাজার রাবার বাগান। বাগানের বেশির ভাগ গাছের জীবনচক্র শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রায় সাত বছর ধরে উৎপাদনে ভাটা পড়েছে। অর্জিত হচ্ছে না উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও। অন্যদিকে শুল্ক কম হওয়ায় বেড়েছে আমদানিও। ফলে যেটুকু উৎপাদন হচ্ছে তাও বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে। অথচ বাগানের কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বছরের পর বছর বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাগানটি অনেকটা বুড়ো হাতির মতো হয়ে গেছে। কাজে আসছে না অথচ কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে এর পেছনে।
উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালের দিকে বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের উদ্যোগে ২ হাজার ১০৪ একর আয়তনের জমিতে শাহজীবাজার বাগানে রাবারগাছ লাগানো শুরু হয়। সব মিলিয়ে কয়েক বছরের মধ্যে বাগানে গাছের সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়িয়ে যায়। তবে জীবনচক্র শেষ হয়ে যাওয়াসহ রোগে আক্রান্ত হয়ে, ভেঙে পড়ে গাছের সংখ্যা কমেছে। বাগান কর্তৃপক্ষের হিসাবে, বর্তমানে সেখানে রাবারগাছ রয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার। কিন্তু এর ২ লাখ ১৯ হাজার বা ৯৪ শতাংশ গাছ জীবনচক্র হারিয়েছে। ফলে প্রতি বছর রাবার উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে তা অর্জন হচ্ছে না। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তবে বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের আওতাধীন অন্যান্য রাবার বাগানের উৎপাদন বেশি হওয়ায় এ লোকসানের কারণে তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না বলেও দাবি করছেন কর্মকর্তারা। নতুন গাছ লাগানোর উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে নাÑএমন প্রশ্নে বাগান ব্যবস্থাপক দায় চাপান বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের ওপর। তিনি জানান, এটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার, তিনি চাইলেও কিছু করতে পারেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন গাছ লাগালেও অন্তত ১৫ থেকে ২০ বছর সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকবে বাগানটিতে। শাহজীবাজার বাগানের মতো বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ১৭টি রাবার বাগান আছে। সবগুলো বাগান মিলিয়ে বছরে গড়ে ১০ কোটি টাকা করে লোকসান গুনছে। বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালের ওই প্রতিবেদনে গত ছয়টি অর্থবছরের লাভ-ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়। সে সময় প্রতিবেদনটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তোলা হয়। কিন্তু এর পরও লোকসান থেকে লাভের ধারায় ফেরাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। লোকসানের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে রাবারগাছের জীবনচক্রের কথা। একটি রাবারগাছের অর্থনৈতিক জীবনচক্র ধরা হয় ২৮-৩০ বছর। কিন্তু এসব গাছ কেটে নতুন করে বাগান সৃজন করা হচ্ছে না। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের অভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে রাবারের দাম কমে যাওয়া, রাবারের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্কারোপ, কারখানার কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়াকে লোকসানের কারণ হিসেবে দেখিয়েছে বনশিল্প করপোরেশন।
রাবারের কষ ও রাবারের সিট তৈরি করে বাজারজাত করা হয়। রাবারের সিট দেশ-বিদেশে বিক্রি করা হয়। প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা এই কাঁচা রাবার স্যান্ডেল, চাকার টায়ার, টিউব, হোস পাইপ, পাটকলের স্পেয়ার পার্টসসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করার কাজে ব্যবহৃত হয়। আর রাবারগাছ জীবনচক্র হারানোর পর তা দিয়ে আসবাব তৈরি করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে করপোরেশন কেন পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে পারছে না? রাবার উৎপাদনের পাশাপাশি কাঠশিল্পের বহুমুখীকরণের মধ্য দিয়েও লোকসান থেকে লাভের ধারায় ফিরতে পারত তারা। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে এই করপোরেশনের সামগ্রিক কর্মকা- মূল্যায়ন করে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলা।
